মহারাজ নন্দকুমার অথবা শতবর্ষ পূর্বে বঙ্গের সামাজিক অবস্থা
চণ্ডীচরণ সেন
"মহারাজা নন্দকুমার রায় ছিলেন নবাবি বাংলার দেওয়ান। ১৭০৫ সালে বীরভূম জেলার নলহাটি থানার ভদ্রপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
ব্রিটিশ আমলে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি ফাঁসির সাজা পান। নন্দকুমার মুর্শিদকুলী খানের আমিন ছিলেন। ফারসি, সংস্কৃত, বাংলা শিখে আলীবদীর আমলে হিজলি ও মহিষাদলের দেওয়ান হয়েছিলেন। ১৭৬৫ সালে নন্দকুমার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির থেকে দেওয়ানি পান বর্ধমান, নদিয়া ও হুগলির। এ জায়গায় আগে দেওয়ান ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস, খাজনা আলয় নিয়ে নন্দকুমারের সঙ্গে হেস্টিংসের বিরোধ শুরু হয়।
সেই ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর জেনারেল হয়ে এসে নন্দকুমার হেস্টিংসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করেন। স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস সহ বাংলার সুপ্রিম কাউন্সিলের অন্য সদস্যরাও হেস্টিংসের বিরুদ্ধে নন্দকুমারের অভিযোগ সমর্থন করেন কিন্তু সে অভিযোগ হেস্টিংস নাড্ড করে নেন। এরপর স্বয়ং ওয়ারেন হেস্টিংস নন্দকুমারের বিরুদ্ধে দলিল জাল করার দুর্নীতির অভিযোগ আনেন, বিচার চলে স্যার ইলাইজা ইম্পের অধীনে। কিন্তু মজা হল ইলাইজা ইম্পে ছিলেন হেস্টিংসের বন্ধু; মামলায় নন্দকুমার লেষী সাব্যস্ত হন। ১৭৭৫ সালের ৫ই আগস্ট কলকাতায় নন্দকুমারকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়।
মহারাজ নন্দকুমারের এই ঘটনাকে উপজীব্য করে শ্রীচণ্ডীচরণ সেন 'মহারাজা নন্দকুমার। অথবা শতবর্ষ পূর্ব্বে বঙ্গের সামাজিক অবস্থা' নামে কালজয়ী ঐতিহাসিক উপন্যাসটি লেখেন। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮৫ সালে, ৬৪/১ মেছুয়াবাজার স্ট্রিট, কলকাতা থেকে। প্রথম সংস্করণে বইয়ের নামে 'মহারাজা' থাকলেও দ্বিতীয় সংস্ক্যাণ শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত সংস্করণে বইটি 'মহারাজ নন্দকুমার অথবা শতবর্ষ পূর্ব্বে বঙ্গের সামাজিক অবস্থা' হয়- এ পর্যন্ত বইটি পাঠকসমাজে ওই নামেই খ্যাত। আমরাও 'মহারাজ নন্দকুমার অথবা শতবর্ষ পূর্বে বঙ্গের সামাজিক অবস্থা' নামটি রেখেছি।
৩ জুন ১৭৭৫ সালে ইনল্যইজা ইম্পে (ইম্পি) মহারাজ নন্দকুমারের প্রাণদণ্ডের আদেশ দেন। ঘটনা হল, সাক্ষী আজিম আলি স্বপ্নে দেখেছে নন্দকুমার বোলাকি দাসের দলিল জাল করেছে। স্বপ্নে দেখা বন্ধুনা তখন ব্রিটিশ আমলে 'প্রমাণ' হিসাবে গ্রহণ করল চারমন জুরি- এভাবে মহারাজ নন্দকুমারের বিচারের নামে গ্রহসন হয়। ওই বিচারের রায়ে ও আগস্ট ১৭৭৫ সালে মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসি হয় বর্তমান রেসাকোর্সের কাছে বুলবাজার মোড়ে। ঐতিহাসিক হেনরি বেভারিজ এই নিষ্ঠুর অবিচারেরা ঘটনাকে 'জুডিশিয়াল মার্ডার' বলেছিলেন। চন্ডীচরণ সেন উপন্যাসে ওই বিচার অধ্যায়টির নাম দিয়েছেন "বিচার না নরহত্যা।' বিচারের নামে এই প্রহসনে অনেক কলকাতাবাসীরা 'রহ্মহত্যা' হয়েছিল বলে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
মহারাজ নন্দকুমারের বিচারের প্রহসনের বিরুদ্ধে কম করে দশ হাজার লোক একযোগে নন্দকুমারের ফাঁসি স্থগিত করার জন্য প্রার্থনা করেন।
অপরদিকে কী মর্মান্তিক বাংলা তখন ওয়ারেন হেস্টিংস ও জন বারগুয়েল এই প্রতিবাদকে চাপা দেওয়ার জন্য কান্ত পোদ্দার, গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ, রাজা নবকৃষ্ণ সহ চল্লিশ-পঞ্চাশ জন লোক সংগ্রহ করে ইলাইজা ইম্পেকে অভিনন্দন বার্তা পাঠায়, যাতে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা থাকে। উপন্যাসের ও আশে পাঠক হয়তো রবীন্দ্রনাথের প্রবাদপ্রতিম লাইনের প্রতিধ্বনি পাবেন।
এ উপন্যাস শুধুমাত্র মহারাজ নন্দকুমারের বিচারকাহিনি নিয়েই নয়। এই উপন্যাস তৎকালীন বঙ্গদেশে নবাবি শাসন চলে যাওয়া, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণ: মুর্শিনবাদ, সৈয়দাবাদ থেকে কলকাতা বিস্তৃর্ণ বাংলার জন-মানুষের নানা লোকাচার, মীরমদন কন্যা এরফান্নেসা কীভাবে হয়ে ওঠেন এস্থরবিবি আর তর্কপঞ্চাননের স্ত্রী মৃত্যুকালে কেন বিলাপ করে বলে, 'আর যদি পৃথিবীতে জন্ম হয়, চেন্জ কুলে যেন আমার জন্ম হয়- মুসলমানের ঘরে যেন আমার জন্ম হয়' তারই এক নির্মম আখ্যান।
এই ঐতিহাসিক উপন্যাসের পাতায় পাতায় তৎকালীন বাংলার ইতিহাসের রসদ।। সেসময় বঙ্গের কৃষক, তাঁতি ও সুবর্ণবণিকদের উপর ইংরেজ শোষণ ও প্রাকৃতিক রোষে বঙ্গভূমি যে মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষে পড়ে চন্ডীচরণ সেনের ভাষায় 'নরক-সদৃশ্য বঙ্গভূমি' হয়েছে তার ঐতিহাসিক দলিল এই উপন্যাস। তৎকালীন নানা নথিপত্র থেকে তথ্যের সততা। যাচাই করে চন্ডীচরণ সেন এই কালজয়ী উপন্যাসটি লেখেন।
এই উপন্যাসের জন্য তাঁকে সরকারেভা রোষে পড়ে শাস্তিও পেতে হয়েছিল। 'মহারাজ নন্দকুমার' উপন্যাসটি জাতীয়-চেতনা জাগিয়ে তোলার কাজ করেছিল, জনপ্রিয়ও হয়েছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণের পাঠের সঙ্গে বন্ধু গৌতম রায়ের পরামর্শে ও প্রস্তাবে সম্মত হয়ে 'মহারাজ নন্দকুমার' বইটি নতুন করে প্রকাশের সিদধান্ত নিই ও যথাসম্ভব সযত্নে এই ঐতিহাসিক উপন্যাসটি প্রকাশ করে আগামীর পাঠকের জন্য বাঙালির অতীতের এই তথ্যবহুল গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের অংশকে জানার সুযোগ করে দিতে পেরে আমরা কৃতজ্ঞ বোধ করছি।
জানুয়ারি, ২০২৬
সন্দীপ নায়ক
পুনশ্চ
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি