অথ রাহুল কথা
কোয়েল ভট্টাচার্য্য
অভিষেক ঘোষ ও সৌরভ মিত্র
অলঙ্করণ - মেধা সিনহা, শিখিন ভট্টাচার্য, ব্রহ্মকমল
প্রভাতের ধর্মদেশনায় রাহুল ধরাকাছা নিয়ে এসে দাঁড়াল। এলোমেলো চুল, আঁধার অক্ষিকোটর, ভঙ্গুর দেহ ক্রমাগত টলছে। রাহুলের অনুরোধেই বুদ্ধ দেশনাসভা ডেকেছেন। নইলে আজ বিশ্রাম নিতেন। বুদ্ধ জানেন, রাহুল তাঁকে ক্ষমা করেনি। তিনি নিজেও ক্ষমা পাবার আশা রাখেননি। আনন্দ কয়েকবার বলেছেন, “রাহুল দেবদত্তের মতো সঙ্ঘ ভাঙ্গতে চাইলে আমি কিন্তু রাহুলকে বাৎসল্যের দোহাই দিয়ে ছাড়ব না।” প্রতিবারই বুদ্ধ উত্তর দিয়েছেন, রাহুল নিজে ভেঙ্গে খানখান হলেও তার পিতার সঙ্ঘ ভাঙ্গবে না।
সবাইকে দায়সারা একখানি প্রণতি ছুঁড়ে রাহুল সোজা বুদ্ধের উদ্দেশ্যে বলল, “আমার আর আমার মায়ের প্রতি আপনি কোনোদিন কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। চিরকাল হয় অবহেলা, না হয় অপমান করে গেছেন। যে রাতে আপনাকে আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সেরাতেও আপনি আসেননি। আমার মা কাঁদতে কাঁদতে চোখ বুজেছেন। আমি নিজের যন্ত্রণার ভার বইতে না পেরে মা’কে আঘাত করেছি। তাঁর সতীত্বে সন্দেহ করেছি। আমার পাপের জন্যও দায়ী আপনি। আপনি আমার মনে সেই পাপচিন্তা গেঁথে দিয়েছেন। আপনি সর্বসমক্ষে আমায় অস্বীকার করেছেন, বলেছেন আপনি আমার জন্মদাতা নন। আশৈশব আমার মনে প্রাণে শুধু একটিই তৃষ্ণা ছিল। আমি আমার পিতামাতাকে একসাথে পেতে চেয়েছিলাম। আপনি আমার ‘পিতা’ সম্ভাষণের অধিকার কেড়েছিলেন। সেও আমি আপনার ব্রহ্মচর্যের দায় বলে মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মা’কে তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে একটু শান্তি দিতেও আপনার ব্রহ্মচর্য ভঙ্গের ভয় হল? আমার মা তো কোনোদিন আপনাকে কামপ্রলুব্ধ করেননি! বরং বাঁধন খুলেছেন। মুক্তি দিয়েছেন। আপনি তাঁকে বিনিময়ে কী দিয়েছেন? তাঁর স্বামীর আর তাঁর দু’দণ্ড নিভৃতে তৃতীয় ব্যক্তি প্রহরী থাকার নিদান। সত্যই আপনি গোপাপতি সর্বার্থসিদ্ধ নন। সর্বার্থসিদ্ধের মধ্যে বুদ্ধের পাশাপাশি হয়তো মারও জীবিত ছিল, কিন্তু সর্বার্থসিদ্ধ তাঁর অর্ধাঙ্গিনীকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে পারতেন। আপনি সর্বার্থসিদ্ধের কালোগুলি ফেলে আসার সময় আলোটুকুও সজ্ঞানে ফেলে এসেছেন। নতুবা আমিই সেই মূর্তিমান অভিশাপ, যার জন্মলগ্নের গ্রহদোষে সর্বার্থসিদ্ধ সংসারবিমুখ হয়েছেন। সর্বোপরি, আমার জীবনের এক এবং একমাত্র বিধেয় শুধু আমার সম্মুখে আসীন বর্তমান শাক্যসিংহকে একজন সক্ষম পুরুষ প্রমাণ করা। তাহলে এই যাবতীয় স্বতঃসিদ্ধের সারাংশ কী দাঁড়াল? একদিকে আমি ‘পিতা’ বলে ডাকলে তথাগতের ব্রহ্মচর্য ক্ষুণ্ন হয়। আবার সেই আমিই যদি নিজেকে জারজ বলি, তথাগতের দ্বাত্রিংশ লক্ষণমণ্ডিত এই অনঙ্গমোহন শরীরের দ্বাদশ বৎসরের সুদীর্ঘ দাম্পত্য জীবন নির্বীর্য্য প্রতিপন্ন হয়। তথাগতকে নির্বীর্য্য প্রতিপন্ন করায় আমার কোনো অহমিকা জাগে না। আবার তথাগতের পুরুষার্থ প্রমাণ করে চলায় কোনো আগ্রহও আমি পাই না। তাই আজ তথাগত, ধর্ম ও সঙ্ঘ সাক্ষী রেখে আমি নিজে নিজেকে পিতৃপরিচয়হীন ঘোষণা করলাম। অদ্যাবধি সবাই আমায় বুদ্ধের সন্তান বলে “সৌভাগ্যবান রাহুলভদ্র” সম্বোধন করতেন। আজ তাঁদের ভুল ধারণা আমি এই মর্মে সংশোধন করে দিলাম, সংসারে সবচেয়ে বড় দুর্ভাগা আমি রাহুলভদ্র। আমি নিজের অস্তিত্বে ঘৃণা করি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বাকি জীবন গৃধ্রকুট শিখরে জনান্তিকে কাটাব। তথাগতের উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই। সদ্ধর্মে আমার হৃদয় আজও পূর্ণ নিষ্ঠাবান।”
যতক্ষণ রাহুল কথা বলেছে, তথাগত তার চোখে চোখ রেখে বেদীতে নিশ্চল হয়ে বসেছিলেন। সে প্রস্থান করলে স্বস্তিকে বললেন, “সঙ্গে যাও। একা ছেড়ো না।”
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি