বিভ্রান্তি
মালবিকা রায়
(আগামীর কল্প বাস্তব)
কল্পবিজ্ঞান বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা আর কল্পনার মিশেলে তৈরি একটি সাহিত্যধারা। একটিই গল্পকে নিয়ে তিনটি বই — ভ্রান্তি, বিভ্রান্তি এবং ভ্রান্তিবিলোপ।
'বিভ্রান্তি'র কিছু অংশ :
নানুক বেরিয়েছিল নৌকা নিয়ে। সঙ্গে আকুমিক আর কুপুন। নৌকাটা পুরোনো হয়ে এসেছে—সেই প্রলয়ের আগেকার ডিজেল বোট—এখন ডিজেলও নেই, ইঞ্জিনও চলে না বহুকাল, এমনি বৈঠা বেয়েই চলছিল এত বছর। মাঝে মাঝে সারাই করা হয়েছে, তবু মনে হচ্ছে এটার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
অথচ নৌকা না হলেও তো নয়। আগে শীতকালে এই পুরো জায়গাটা বরফে জমে থাকত, নানুকের দাদু কুকুরের স্লেড নিয়ে চলে যেত সেই আলাস্কা—ফিরে আসত বল্গা হরিণের চামড়া, মাংস আর কাঠ নিয়ে। সেসব আজকালকার বাচ্চারা বিশ্বাসই করে না। করবে কী করে, এখন তো আবহাওয়া আর ভূপ্রকৃতি সবই বদলে গেছে।
এই গ্রীনল্যা ন্ড এখন সত্যি সত্যিো অনেক গ্রীন—গাছপালা হয়েছে কিছু—পাইন আর ফার। দু-একটা বার্চও। পার্মা ফ্রস্ট গলার পরে চাষবাসের চেষ্টা করছে তাদের গ্রামের অনেকে। যদিও অনুর্বর জমিতে, অনভিজ্ঞ লোকে রাই আর যবের বেশি তেমন কিছু ফলাতে পারেনি। তবু সেটুকুও অনেক। আগেকার মতো কারখানা আর বন্দর থাকলে, কয়েকটা লোহার লাঙলের ফলা কিম্বা ট্রাক্টর যোগাড় করতে পারলে কাজটা সহজ হত। তবে অনেকে এসব অসুবিধার মধ্যেরই লড়ে যাচ্ছে।
নানুকের অবশ্যট এসব ভালো লাগে না—চাষবাস কি এস্কিমোদের কাজ? তারা মাছ ধরবে, হার্পুন নিয়ে তিমি বা সীল শিকারে যাবে, আর্কটিক ফক্সের হাত এড়িয়ে বুনো হাঁসের ডিম আনবে—এই তো সবাই জানে। চাষের কাজ করতে গিয়ে আজকালকার ছেলে ছোকরারা হাস্কি কুকুরদের পরিচর্যা করতে, হার্পুন ছুঁড়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে, স্লেড গাড়ি বানাতে ভুলতে বসেছে।
কী আর বলবে নানুক, ওর নিজের নাতি জানে না ইগলু কি জিনিস। ওরই বা দোষ কী, এখন শীতে ছুটকো ছাটকা যা বরফ পড়ে তাতে কি আর ইগলু হয়? অথচ নানুক বেড়ে উঠেছে ইগলুতেই…প্রত্যওন্ত গাঁয়ে থাকত ওরা—বড় ইগলুতে বাবা-মা-ভাই-বোন, দিদিমা-দাদু সব মিলিয়ে জনা দশেক লোক। পাশের ইগলুতে থাকত ছটা হাস্কি। দু-চার সপ্তাহের জন্যর যখন গরম পড়ত, নানুকের ভালো লাগত না। মেরুশেয়াল আর ভালুকের চামড়ার কোট আর টুপিতে তখন গরম লাগত খুব।
ওগুলো নাকি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী, তাই মারা উচিত নয় চামড়া বা মাংসের জন্যর। কোপেনহেগেন থেকে বিজ্ঞানীদের দল নিয়ে হান্স যখন আসত, তখন বলত। আর এখন? মানুষই তো বিলুপ্তপ্রায়—এনডেঞ্জার্ড! অত বড় বড় কথা বলল ওই সব শহুরে বাবু-বিবিরা—মৌমাছি বাঁচাও, সীল বাঁচাও, তিমি বাঁচাও—তারপর নিজেরাই পুরো গ্রহটাতেই আগুন ধরিয়ে দিল। লোভের তো সীমা পরিসীমা নেই—তাদের এই গ্রীনল্যাান্ড, সেই নিয়ে রাশিয়া, আমেরিকা আর ডেনমার্কের মধ্যেু শকুনের মত টানাটানি। কী, না মাটির নীচে যা খনিজ পদার্থ আছে—তেল বা লিথিয়াম—সব ওদের চাই। এ বলে আমি নেব, ও বলে আমি। আর নানুকরা যে হাজার বছর ধরে এই বরফ, মেরুভাল্লুক আর নেকড়ের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে, তাদের বুঝি কোনো অধিকার নেই?
বেশ হয়েছে, নিজেদের মধ্যেখ লড়াই করে ওই সব কটা লোভী দেশ ধ্বংস হয়েছে। সঙ্গে গোটা পৃথিবীটাকেও যে প্রায় শেষ করে এনেছে এটাই দুঃখ। বিশাল বিশাল তিমি মাছ মরে ভেসে উঠেছিল—খুব অশুভ সংকেত। আগে ওরা জ্ঞান দিত তিমি শিকার না করতে, তারপর এমন সব বোমা-টোমা ফেলল যে শুধু তিমি কেন, জল-স্থলের অর্ধেক প্রাণী শেষ হয়ে গেল।
নানুকের দল নৌকা নিয়ে ফিরে এল ঘন্টা কয়েক পরেই। মাছ কিছু পাওয়া গেছে, তাই মনটা সবার বেশ খুশি ছিল। কিন্তু বাড়ি ফিরে এসে অবাক হয়ে গেল নানুক। হান্স এসেছে। প্রলয়ের সময় যখন চারিদিকে উথালপাতাল, তখন কোপেনহেগেন থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে এসেছিল হান্স। সবাই অবাক হলেও কিছুদিন পরেই বোঝা গেছিল কারণটা। সভ্যন শহরগুলো ধ্বংস হয়ে গেলেও গ্রীনল্যা ন্ডের এই গ্রাম যে বেঁচে যাবে সেই হিসেবটা হান্স ঠিকই করেছিল।
কিন্তু নানুকের মেজ নাতি ইনুয়িট যে কী ওর সঙ্গে সারাক্ষণ ফুসুর ফুসুর করে, সেটাই নানুক বোঝে না। ছেলেটা অপদার্থ এক নম্বরের—না পারে মাছ ধরতে, না শিকার করতে, না চাষবাস। সারাক্ষণ যন্ত্রপাতি নিয়ে খুটখাট—তাও কাজের যন্ত্র নয়…কী সব রেডিও আর অ্যা ন্টেনা নিয়ে ভাঙা শেডটায় বসে থাকে, বন্ধু হল একমাত্র ওই হান্স। হান্সের থেকে ডেনিশ ছাড়াও ইংরেজি শিখেছে। কী কম্মে যে লাগবে কে জানে! আগে হলেও বা কানাডা কিম্বা আলাস্কা গেলে কাজে দিত, এখন কোনো মানেই হয় না। ........
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি