ভ্রান্তিবিলোপ
মালবিকা রায়
(আগামীর কল্প বাস্তব)
আজ পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে অল্প সংখ্যক মানুষের অর্থ এবং ক্ষমতার লোভের ফলে বিশাল বিপর্যয়ের করাল ছায়া। পৃথিবীর সর্বত্র আজ নিষ্ঠুর আগ্রাসী মানুষের দল সভ্যতাকে সংকটগ্রস্ত করে ফেলেছে। কেমন হবে আগামী দিনগুলো ? এই ভাবনা নিয়েই রচিত হয়েছে মালবিকা রায়ের কল্পবিজ্ঞান সিরিজের তিনটি বই মিলিয়ে একটি অসামান্য কাহিনি।
যেখানেই অত্যাচার আর অবিচার, সেই মাটি থেকেই উঠে আছে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ। এই কাহিনির মধ্য দিয়েই উঠে আসবে টানটান উত্তেজনার সেই প্রতিরোধের কথা।
'ভ্রান্তিবিলোপ' কাহিনীর কিছু অংশ :
মঙ্গল আর বৃহস্পতির মাঝখানের বিশাল, অন্ধকারময় অঞ্চল—অ্যাস্ট্রয়েড বেল্ট। হাজার হাজার পাথুরে খণ্ড মহাকর্ষের নিঃশব্দ সুরে নাচছে, ঘূর্ণায়মান, অনিয়মিত গতিতে। গ্রিফিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অ্যাস্ট্রয়েড বেল্টে ঢোকার ঠিক আগে। ফ্যালকন মিলিয়ে গেছে রেডার থেকে, গেছে মঙ্গলের অভিমুখে। এখন আর তার কোনো চিহ্ন নেই। সোমক অপেক্ষা করে আছেন—মায়াদের বিপদমুক্ত করার জন্যই অপেক্ষা করে আছেন। ইউয়ান আর ফিনস্টাইনের তিনটে শিপ আসছে গ্রিফিনের পেছনে। নিজের পিঠে টার্গেট সেঁটে এখন তাদেরই অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁর প্ল্যান ঝুঁকিপূর্ণ, তবে এটাই আপাততঃ একমাত্র উপায়।
গ্রিফিনকে তাড়া করে আসা প্রথম শিপ ভাইপার-৭ অবাক হয়ে দেখল গ্রিফিন মঙ্গলের দিকে না গিয়ে এগিয়ে চলেছে বৃহস্পতির দিকে।
“স্যার, আমরা কি যাব ওদিকে? নাকি মঙ্গলের দিকেই যাব?” ভাইপার-৭-এর ফার্স্ট অফিসার পেত্রিকাপিলা প্রশ্ন করলেন।
“আমাদের তো ক্লিয়ার ইনস্ট্রাকশন আছে গ্রিফিনকে ফলো করার। তাই করুন।” ভাইপারের ক্যাপ্টেন মিরোভিচ বললেন।
“কিন্তু ওটা তো একদম অজানা এলাকা…কত দূর যাব? ফুয়েলের কথাটাও তো ভাবতে হবে।”
“আপাততঃ সেটা না ভাবলেও হবে। গ্রিফিনেরও তো ফুয়েল অনন্ত নয়। চলুন ওটার পেছনে, তারপর দেখা যাবে। লোকেট করতে পারছেন তো ওটাকে?”
“হ্যাঁ, ওই তো…অ্যাস্ট্রয়েড বেল্টের কাছেই আছে মনে হচ্ছে। কিন্তু মনে হচ্ছে স্পীড কমিয়ে দিয়েছে…কেন বলুন তো?”
“অ্যাসট্রয়েড বেল্টের মধ্যে দিয়ে রকেট ম্যানুভার করা সহজ নয়। সেই জন্যই হয়তো। চলুন ওর পেছনে।”
সেই মতোই “ভাইপার-৭”, “নাইট স্টিং” আর “রেড ট্যালন”, গ্রিফিনের পিছু ধাওয়া করল। প্রথম দুটো পৃথিবী থেকে প্যাট্রিকের পাঠানো, অন্যাটা চাঁদের থেকে ইউয়ানের পাঠানো। ভাইপারের ক্যাপ্টেন মিরোভিচ ঠিক বলেছেন, গ্রহাণুপুঞ্জের মধ্যে দিয়ে রকেট ম্যানুভার করে নিয়ে যাওয়া সহজ নয়। বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে যে ছোট-বড় বিভিন্ন সাইজের গ্রহাণু বা অ্যাস্ট্রয়েড, তাদের কিছু কিছু নেহাৎই পাথরের টুকরোর সাইজের, কিছু আবার ছোটখাটো উপগ্রহের মাপের। কিছু পাথরের, কিছু বরফের, কিছু বা ধাতব। উচ্চগতিসম্পন্ন রকেটশিপ এগুলোতে ধাক্কা খেলে বিপদ অনেক।
এই বিপদের কথা সোমক জানেন বৈকি! তবু তিনি অপেক্ষা করে আছেন—এই বিপদকে কাজে লাগিয়ে যদি তাড়া করা এই শিপ তিনটেকে পিছু ছাড়ানো যায় সেই আশায়। সাধারণ লোক যেটাকে বিপদ বলে ডরায় সেটাকেই নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারাটাই তো নেতৃত্বের প্রমাণ—ইনোভেশন অ্যান্ড ইনজেনুয়িটি। তাড়া করে আসা শিপগুলো রণসাজে সজ্জিত, অথচ অস্ত্রশস্ত্র তো তাঁর তেমন নেই এই গ্রিফিনে। নিজের বুদ্ধি আর দক্ষতাই ভরসা। ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে এই গ্রহাণুগুলোই অস্ত্র হতে পারে—ব্রহ্মাস্ত্র!
সোমক বিশ্রাম নিতে গেলেন শিপ অটো পাইলটে দিয়ে। গন্ডগোল কিছু হলে অ্যালার্ম বাজবে। শিপের রোবট সিমোন-২৫৫-কে সব দায়িত্ব দিয়ে প্রোগ্রাম সেট করে দিয়েছেন। যুদ্ধের আগে একাকী এই যানে তাঁর বিশ্রাম জরুরি। কী ভীষণই ফাঁকা লাগছে এই মহাকাশযান—তাঁর র্যা গট্যাগ ক্রুদের ছাড়া। কেমন আছে মাইক, ফণী,চি? অ্যালেক্সের মাথাব্যথাটা কি এখনো আছে? ডাক্তার দেখানো দরকার—ভালো ডাক্তার কোথায়?
সারা! সারা ছিল এক্সসেলেন্ট ডাক্তার, অথচ প্রেসিডেন্ট হয়ে কী ভাবল ও? প্যাট্রিকের সঙ্গে হাত মেলাল শেষ অব্দি? ছি! কতবার ভেবেছেন রূপসার তীরে বসে, যে সারা হয়তো অন্য কারো ঘরণী এতদিনে। কিন্তু সে যে এর চেয়ে সহস্রগুণে ভালো ছিল। তাঁকে মৃত জেনে অন্য কাউকে বরণ করে নিলে তিনি সারাকে দোষ দিতে পারতেন না, কিন্তু ক্ষমতার লোভে প্যাট্রিকের সঙ্গে আঁতাত? ভাবতে পারল ও যে প্যাট্রিকের হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি জেনোসাইড ঘটিয়েছেন? নিজের মেয়ে, মায়া—
—মায়া…বড় মায়া…ভাবলেই বুকে মোচড় পড়ে। কিছুদিন আগেও তো জানতেন না যে ও আছে। কটা মাত্র দিনের জন্য এল তাঁর বুক জুড়ে— যদি জানতেন এত তাড়াতাড়ি আবার ওকে যেতে দিতে হবে তাহলে ওকে বুকে জড়িয়ে বসে থাকতেন সর্বক্ষণ, খামোখা কত বকাবকি করলেন—আর কি হবে দেখা কখনো? কী দুর্ভাগা তিনি। তা হোক, দুর্ভাগ্য সব তাঁর ভাগে আসুক, মায়ার গায়ে তিনি আঁচটি লাগতে দেবেন না। সেইজন্যই তো নিজেকে টোপ করে বসে আছেন তিনি অনন্ত প্রতীক্ষায়।
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি