তার কোনো নাম ছিল না। কোনো পরিচিতি তৈরি হয়নি। তখনও সে ছিল জলের নীচে, অতলের শিকড়েবাকড়ে- তখনও 'মানুষ' হয়ে ওঠেনি যে মানুষেরা, তাদের মুখে মুখে, আনন্দের প্রকাশ, প্রকৃতির বন্দনায় বাত্ময় হয়ে উঠছিল। পদ-সঞ্চালন, ধ্বনি ছিল তাদের শিকার পাওয়ার আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। আগুনের সঙ্গে সেই প্রস্তরযুগীয় মানুষদের আচমকাই পরিচয় ঘটে যাওয়ার পর তাদের বিবর্তন ঘটতে লাগল, মস্তিষ্কে বুদ্ধির সংযোগ ঘটতে থাকল। বাস্ফূর্তিও প্রকাশ হতে থাকল সুরে-শব্দে। আগুন হল তাদের কাছে জাদু, চরম বিস্ময়কর অলৌকিক ঘটনা। কার্যকারণ বোঝার বুদ্ধি তো তখন তাদের থেকে হাজার মাইল দূরে। তাদের বিশ্বাস, আগুনের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটতে লাগল মুখে মুখে কথার পর কথা গেঁথে। মাটির স্তর পেয়ে সেইসব শিকড়ের মূল থেকে কথামালার অঙ্কুরোদ্গম হতে থাকল। কৃষিযুগে এসেও আগুন পাওয়া নিয়ে মানুষ বিশ্বাস দিয়ে নানা কল্পকথা তৈরি করতে থাকল। আর্যায়িত হওয়া মানুষ সমাজ, পরিবারপ্রথার মধ্যে দিয়ে ক্রমশ এগোতে থাকল, তারসঙ্গে এগোতে থাকল গল্প বলা, গল্প শোনা। অবসরে, আনন্দে স্ফূর্ত হত গল্পগাছা- অলৌকিক শক্তি, শস্যকামনা, সদ্য পাওয়া মঙ্গলকারী দেবদেবী-ভাবনা, কল্পিত ও বাস্তবের পশুপাখি ইত্যাদি হত গল্পের বিষয়, মুখে মুখে সেসব উড়ে বেড়াত, হাওয়ায় উড়ে যাওয়া ফুলের রেণুর মতো। তার পাশাপশি অনার্যরা গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনে দৃঢ়ভাবে থেকে নিজেদের মতো করে এগিয়ে চলতে থাকল। সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলল পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া কৃষ্টি, টোটেম-বিশ্বাস। গাছ-পাথর-নুড়ি হল তাদের ঈশ্বরপ্রেরিত প্রতিনিধি। এসবই হল তাদের অলৌকিক শক্তিকে কেন্দ্র করে গল্পকথার উৎসার। সারা বিশ্বে আদি জনজাতির প্রতিনিধি গোষ্ঠী-মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে ছিল ও আছে তাদের নিজস্ব অজস্র লোককথা। প্রায় অপরিবর্তিত হয়ে, কিছুটা সংযোজিত হয়ে সেসব গল্প মুখে মুখে নামহীনভাবে এগিয়ে চলছে, এই এখনও।
আঠারো শতকের প্রথমদিকে, সদ্যই বলা যায়, যখন লিখিত সাহিত্য রমরমিয়ে চলছে, তেমন সময়ে প্রথমে জার্মানে, প্রায় সমসময়ে ফিনল্যান্ডে ও তারও পরে ইউরোপ, আমেরিকার লোকবিজ্ঞানী, নৃতাত্ত্বিক, গবেষক, খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের প্রবল কৌতূহল ও আগ্রহে লোককথা, গান, প্রবাদ ইত্যাদি ব্যাপকভাবে সংগৃহীত হতে থাকে। বেশিটাই আদি জনজাতি গোষ্ঠীগুলির কাছ থেকে, তার বাইরে কৃষকদের কাছ থেকে। লোকবিজ্ঞানী, গবেষকরা সেসবের গড়ন, বিষয়, ঐতিহ্য, মোটিভ, বৈচিত্র্য দেখে অবশেষে মৌখিকভাবে বহমান সংস্কৃতিকে 'সাহিত্য-সম্মান' দিলেন। বিচার করে নয়, মুগ্ধতা থেকে সেসব সাহিত্য বলে গ্রহণীয় হল। লিখিত সাহিত্যের পাশাপাশি মৌখিক সাহিত্য অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হতে থাকল। মধ্যযুগে অনুবাদিত হয়ে এল প্রায় ৪০০ বছর ধরে মৌখিকভাবে লালিত আরবের রাজদরবারে সম্মানিত আরব্যরজনির গল্প। গ্রিক ক্রীতদাস ইশপ সংগ্রহ করেছিলেন কৃষকদের লোককথা, যা আমাদের কাছে ইশপের গল্প বলে আদৃত। বিষ্ণুশর্মা সংগ্রহ করলেন ভারতের কৃষকদের নীতিকথা পঞ্চতন্ত্রের গল্প। এইরকম তো আরও আছে।
আমাদের বাংলায় কত কত কাল আগে থেকে একশো বছর আগেও মৌখিক ঐতিহ্য নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল গল্পকথা, গীতিকথা, গান, ধাঁধা, ছড়া, প্রবাদ, বচন। ঘরে ঘরে সংসারের ছেলেপুলেদের জন্য ঠাকুমা-দিদিমা-মাসি-পিসিরা গল্প বানাতেন। তাঁদের কল্পনার উড়ান ছিল রূপকথার দেশে, রাজপুত্র-রাজকন্যারা হত চরিত্র, কখনও পশুপাখি, দৈত্যদানো, ভূতপেতনি হাজির হত তাঁদের গল্পে। শুধু তো গল্প নয়, ছেলেমেয়ে ভুলোনো ছড়া, নানা ব্রতের ছড়া-আনন্দ-বিষাদের গান-কথা, নিষেধ-নির্দেশ নিয়ে বিস্তর বচন স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে প্রকাশ হত। শ্রুতিতে রাখতেন অনুজেরা, তারাও বৃদ্ধকালে নাতি-নাতনি-পড়শিদের সেসব শোনাতেন, নিজেরাও রচক হতেন। ঘরের বাইরেও কত লোককাহিনি, গান, কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা থেকে প্রবাদ-ছড়া, বচন, ধাঁধা মুখে মুখে তৈরি হয়ে সমাজের মধ্যে উড়ে বেড়াত। কত কত গান শ্রমজীবনকে কেন্দ্র করে, অবসরের বিনোদনে, কারও না কারও সৃজনীক্ষমতার জোরে মুখে মুখে তৈরি হত। হেন কোনো বিষয় নেই যা সেসবের অন্তর্ভুক্ত হত না! ব্যাপকভাবে তার চলাচল ছিল, হারিয়ে যাওয়াও সমাজের স্বাভাবিক গতি ধরেই চলত।
এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ ও তাঁর ছড়া সংগ্রহে উৎসাহের কথা বলতেই হয়। 'লোকসাহিত্য'-এ ছড়া প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন, 'প্রাচীনা ভিন্ন আজকালকার মেয়েদের কাছে এইরূপ (গ্রাম্য ছড়া) কবিতা শুনিবার প্রত্যাশা নাই। তাহারা ইহা জানে না এবং জানিবার কৌতূহলও রাখে না। বর্ষীয়সী স্ত্রীলোকের লোকসাধারণের নিজস্ব সৌন্দর্যচেতনা। ধান্ধার পুঁজিতন্ত্রে পরিবর্তিত ব্যক্তি তথা সামাজিক মূল্যবোধের আত্মমগ্ন সময়ে ভেঙে পড়েছে যৌথজীবন। রিলকেন্দ্রিত নাগরিক অভিরুচি দখল করেছে জনতার মন; অভিবাসিত মানুষ, শিকড়চ্যুত সংস্কৃতির আদ্যপ্রাণ। ছেলেবেলা মেয়েবেলা থেকে প্রাচীন পিতামহী আজ নির্বাসিত, প্রতিবেশছিন্ন। অসহিষ্ণুতায় অস্থির শোনার মন। কিংবদন্তি, মিথ, পুরাকল্প-চরিত্র কথাকাহিনি গালগল্পের আসর থেকে নেমে এসে এখন ভয় দেখায়, দমিত করে বিকল্প স্বর। বিরাজমান আর্থ-রাজনীতি সংশ্লিষ্ট নাগরিক সভ্যতার বিস্তারে ভাঙাহাট মৌখিক সাহিত্যের অস্তিত্ব আজ ক্ষীয়মাণ। লিখিত সাহিত্যে রূপান্তরিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ পত্রে কোথাও বা স্থানসংকুলিত হয়েছে। কিন্তু, শ্রুতি-দৃশ্য কথা যখন 'টেক্সট' হয়ে ওঠে; স্থানকালের সাপেক্ষতা, যৌথতার পরিপার্শ্ববিহীনতায় যখন মৌখিক সাহিত্য তার অনন্য স্বতন্ত্র উপস্থাপন রীতি-বৈচিত্র্য হারিয়ে শুধুমাত্র এককপাঠ হয়ে ওঠে, তখন নাগরিক অনুবাদকের অধিপতি ভাষাকাঠামো, শৈলীভেদ, সৌন্দর্যচেতনা, মনোভঙ্গি সপ্রাণ কথকতাকে পুঁথির নিগড়ে নিঃসাড় করে রাখে। এ এক অপ্রতিরোধ্য আর্থ-সাংস্কৃতিক ফলশ্রুতি। সময় রে বধিবে কে!
রবীন্দ্রনাথ 'ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণে' বলেছেন- 'আমরা নৃতত্ত্ব অর্থাৎ ethnology-র বই যে পড়ি না তাহা নহে, কিন্তু যখন দেখিতে পাই, সেই বই পড়ার দরুন আমাদের ঘরের পাশে যে হাড়ি-ডোম-কৈবর্ত-বাদি রহিয়াছে তাহাদের সম্পূর্ণ পরিচয় পাইবার জন্য আমাদের লেশমাত্র ঔৎসুক্য জন্মে না তখনই বুঝিতে পারি, পুঁথি সম্বন্ধে আমাদের কত বড়ো একটা কুসংস্কার জন্মিয়া গেছে- পুঁথিকে আমরা কত বড়ো মনে করি এবং পুঁথি যাহার প্রতিবিম্ব তাহাকে কতই তুচ্ছ বলিয়া জানি'। অভিজাত উচ্চকোটির সাহিত্য সংস্কৃতিকে একান্ত আধুনিক ও প্রয়োজনীয় মনে করে আমরা আমাদের গোষ্ঠীবদ্ধ, মৃত্তিকাজীবনঅন্বিষ্ট সাহিত্য ভুলেছি। অথচ দেশকে জানার উপায় তার সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মরিক্ত ঘর্মসিক্ত মানুষদের মুখে-মুখে রচিত, বাহিত ছড়ায় গানে, 'প্রাচীন মন্দিরের ভগ্নাবশেষে, কীটদষ্ট পুঁথির জীর্ণ পত্রে, গ্রাম্য পার্বণে, ব্রতকথায়, পল্লির কৃষিকুটিরে'। উপনিবেশিত মনকে ফিরে যেতেই হবে আপন সংস্কৃতির সেই প্রত্নস্মৃতিমালায়, কথামালার বাবিস্তারে; স্বদেশের শিকড়ে পৌঁছানোর অপর কোনো পথ নেই আর।পদাতিক সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর নিজের বাংলাদেশ, প্রকৃত বাংলাদেশের স্বরূপ সন্ধান করতে পৌঁছে গিয়েছিলেন গারো পাহাড়ের সন্নিকটস্থ হাজং গারো কোচ বানাই মার্গান ডালু অধ্যুষিত আদিবাসী জীবনে। সেখানে চৈতননগরে, হিঙুরকোনায় খগ মোড়ল, আমুতো মোড়লের বংশধরদের মুখে শুনেছেন কতশত বিদ্রোহের গল্প। যৌথঅবচেতনে সঞ্চিত হয়ে প্রবহমান থাকে প্রতিরোধের অন্তঃসলিল পরম্পরা। ক্ষমতাধর স্মৃতিধার্য সেই যৌথজীবনের অনুৎপাদনশীল অবসর, সরল স্নিগ্ধ মধুর অভাবক্লিষ্ট লড়াকু গল্পগুলোকে মুছে দিতে তৎপর। আমাদের প্রচেষ্টা হবে তাই স্মৃতিহীনতার মহামারি থেকে মা-ঠাকুরমা বাপ-ঠাকুরদার গাথাগল্প বাঁচিয়ে রাখা। বর্তমান সংকলন প্রকাশ মূলত এই কৈফিয়তে। আসুন পাঠক, ইত্যবসরে আমরা মৌখিক সাহিত্যের অন্তর্লোকে প্রবেশ করি।
ডিসেম্বর, ২০২৫
লীনা চাকী ও সুশান্ত পাল