রুধির ধারায় রহস্য : পার্থ দে

(0 পর্যালোচনা)
লিখেছেন/সম্পাদনা করেছেন
পার্থ দে

মূল্য
₹230.00
পরিমাণ
মোট দাম
শেয়ার করুন

রুধির ধারায় রহস্য 

পার্থ দে 

প্রচ্ছদ : মিশন মণ্ডল 

আজ স্টেডিয়ামে সাধারণ কোনও দর্শক নেই। আমরা দশজন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ছাড়া আছেন আর মাত্র জনা পনেরো মানুষ। সেই মানুষগুলোর দাঁড়ানো কিম্বা বসার ভঙ্গি বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, তাঁরা খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। ব্রার সাহেবের মতো আরও দু’-চারজন পুলিশ অফিসার আছেন।  দু’-একজন আছেন, যাঁরা ভিডিও ক্যামেরা আর ওবি ভ্যান নিয়ে এসেছেন। আর আছেন একজন, যিনি সবার মধ্যমণি হয়ে আছেন। তাঁকে আমি চিনি। তিনি হলেন আমার শ্রদ্ধেয়া ‘মেহের মা’! সাদা ধবধবে মহার্ঘ্য পোশাক আর প্রাদা শেডের রোদ-চশমায় যেন আজ মেহের মায়ের অনন্য এক রূপ। তবে উকিল সেহগল আঙ্কলকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মেহের মা আজ বসে আছেন বুদ্ধ সার্কিটের গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডে, যেখানে চোদ্দ বছর আগে আমার বাবা বসে খেলা দেখতেন।

  ঠিক ঘণ্টা দেড়েক আগে বুঝতে পারলাম, আমাদের এখানে আনা হয়েছে ফর্মুলা ওয়ান গাড়ির রেসের জন্য। আমরা সবাই ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামি; হয়তো আমার মতো সবাই একই রকমের শেষ ইচ্ছে ব্যক্ত করেছে। স্বপ্নের মতো একবার এই গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে উত্তেজনা উপভোগ করতে চায়। আমিও জীবনে প্রথম বার এবং সম্ভবত শেষ বারের মতো এই আনন্দময় উত্তেজনা উপভোগ করতে চাই। আমি অগ্নি নিরোধক জ্যাকেট, বালাক্লাভা আর হেলমেট পরে আমার গাড়িটায় গিয়ে বসলাম। এই গাড়িটাতেই আমি তিনদিন প্র্যাকটিস করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমাকে চার নম্বর গ্রিড পজিশন দিয়েছিল ওরা। রেস শুরুর শেষ মুহূর্তে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের দিকে তাকালাম। বাবা আজ নেই, কিন্তু মেহের মা তো রয়েছেন। দেখলাম, উনি আশীর্বাদের ভঙ্গিতে দু’টি হাত তুলে বাঁ হাতের একটি আঙুল আর ডান হাতের তিনটি আঙুল দেখালেন। রেস শুরু হবে আরও মিনিট খানেক পরে। আমার ইঞ্জিনও তখন ট্রায়াল রানের একটা সুযোগ পেয়েছে। হঠাৎ আমার জ্যাকেটের ডান পকেটে একটা চিরকুট আবিষ্কার করলাম। ভাঁজ করা ছোট্ট কাগজটা খুলে দেখি, দু’ লাইনের একটা রাইম— ‘ওনলি দ্য ফার্স্ট থ্রি, ওয়াক অ্যাওয়ে ফ্রি!’

  আর মাত্র চারটে ল্যাপ বাকি আছে। এ এক চরম খেলা খেলছি আমরা! এখন হারাধনের মাত্র ছয়টি ছেলে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে। ইতিমধ্যে গুয়াহাটি জেল থেকে আসা ভরত গগৈ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে গেছে; শেষ সাতটা ল্যাপের আগে ওর গাড়ির ইঞ্জিন ব্রেকডাউন হয়েছে। আমার মনে পড়ছে, মেহের মা বলতেন, “পৃথিবীর সব অপরাধ শাস্তিযোগ্য, কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই; আছে একমাত্র ঈশ্বরের। এটাই ‘মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তি বিল’-এর সারকথা।” কিন্তু আজ এই ভয়ংকর খেলার মাঠে মেহের মা কী করছেন! আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাতের আঙুলের মুদ্রায় উনি কী বোঝাতে চাইলেন? আমি আর বেশি ভাবতে পারছি না, চার রাউন্ডের মধ্যে এই ভয়ংকর খেলা শেষ হয়ে যাবে। আমার মাথার মধ্যে শুধু ঘুরছে— ‘ওনলি দ্য ফার্স্ট থ্রি, ওয়াক অ্যাওয়ে ফ্রি!’ আমাকে রেসের প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকতেই হবে, না হলে কোনও দিন আমার মুক্তি হবে না।

  আমার কারেন্ট পজিশন আগের মতোই চার। একে লিড করছে জান মহম্মদ, দুইয়ে প্যাট্রিক লোবো আর আমার থেকে মাত্র আট মিটার আগে বেনুগোপাল রাও রয়েছে তিন নম্বরে। রেহান মালিক ইতিমধ্যে আমার পিছনে চলে এসেছে। জানতাম, ও দুর্দান্ত ভাবে আবার প্রতিযোগিতায় ফিরে আসবে। আমি নীল আকাশের বুকে চিলটাকে খুঁজছিলাম; জানি না চিলটা এবার আকাশের গায়ে কার মৃত্যুচিহ্ন এঁকে দেবে। আমার চোখদুটো ফের বুজে আসছে, আমার অবসন্ন শরীর চিরঘুমে তলিয়ে যেতে চাইছে। আমার মাথার মধ্যে তবু একটা খটকা—আমাদের এই রেসে কেন নামানো হয়েছে? আমাদের কি মানুষের বিচারালয় থেকে বের করে ভগবানের দরবারে পেশ করা হয়েছে শেষ বিচারের জন্য? ঠিক যেমনটা মেহের মা বলেন! না কি অন্য কোনও গভীর ষড়যন্ত্র আছে এর পিছনে? মেহের মায়ের আঙুলের মুদ্রার রহস্যটা কী?

  শেষ ল্যাপের প্রবল উত্তেজনার মধ্যেও আমি কেঁপে উঠি। মেহের মায়ের আঙুলের মুদ্রার রহস্য আমি বুঝতে পেরেছি। এক আঙুল মানে এক ডলার, তিন আঙুল মানে তিন ডলার! তার মানে এই রেসে আমার ওপর বাজি ধরা হয়েছে— এক ডলারের জন্য তিন ডলার!

  আমাদের এই মরণ-দৌড় নিয়ে ফাটকা খেলছে ওরা। সম্ভবত ওই ভিডিও ক্যামেরায় তোলা ছবি সরাসরি অন্তর্জালে লাইভ স্ট্রিমিং হচ্ছে। আর জুয়াড়িরা দর হাঁকছে— একে তিন, একে চার কিম্বা একে পাঁচ।

  অথচ মেহের মাকে আমি নিজের মায়ের জায়গায় বসিয়ে ছিলাম। ঘৃণায় অবশ হয়ে আসে আমার হাত-পা। প্রচণ্ড বিবমিষা জাগে। আমি আর পারছি না! মনে হচ্ছে শেষ পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বটা বুঝি কয়েক আলোকবর্ষ। কিন্তু আমাকে পারতেই হবে! এই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আমাকে মুক্ত হতেই হবে। গতকাল হলঘর থেকে চুরি করে আনা মেথাম্ফিটামিনের বড়িটা আমার হেলমেটের তলার দিকে আঠা দিয়ে সাঁটা আছে, আমি জিভ দিয়ে সেটা চেটে নিই আর প্রার্থনা করি, ভগবান আমাকে আর কয়েক মুহূর্ত যেন জাগিয়ে রাখেন। আমার ছেলেবেলার আইকন সেবাস্টিয়ান ভেটেলকে স্মরণ করে আমি  সামনে এগিয়ে চলি তীব্র গতিতে। আমাকে কিছু একটা করতেই হবে!

  দেখতে পাই, ফিনিশিং লাইন আর মাত্র পাঁচশ মিটার দূরে। সবার সামনে  জান মহম্মদ। প্যাট্রিক লোবো পিছন থেকে যেন ওর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। বেনুগোপাল আর আমার মধ্যেকার আট মিটার ফারাকটা ক্রমেই মুছে আসছে। মাথা তুলে একবার আকাশের দিকে তাকাই; চিলটাকে খুঁজি। ওই তো চিলটা ওপর থেকে ফের উল্লম্ব ভাবে নোজডাইভ দিয়ে তিরগতিতে নীচের দিকে নেমে এলো; এবার আবার বৃত্তাকারে ওপরে উঠে মৃত্যুচিহ্ন ‘D’ এঁকে দেবে! আমি দম বন্ধ করে ওর চলনের দিকে চেয়ে থাকি। এবার কার পালা; বেনুগোপাল না কি আমি?

  কিন্তু, ও কী! চিলটা তলা থেকে বৃত্তাকারে ওপরে না উঠে আনুভূমিক ভাবে আকাশের গায়ে ইংরেজির ‘L’ অক্ষরটা এঁকে দিচ্ছে কেন?

  কী আছে কথকের ভাগ্যে? পারবে কি সে এই ফর্মুলা ওয়ান কার রেসে জিতে নিজেকে মুক্ত করতে? না কি নিয়তি তার জন্য অপেক্ষা করছে ফাঁসির দড়ি অথবা দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়ে? জানতে হলে পড়ুন পার্থ দে’র লেখা ‘ফিনিক্স’, যা কি না এই ধরনের দশটি ছোট-বড় গল্পের সংকলন ‘রুধির ধারায় রহস্য’ বইয়ের অন্তর্গত।

পর্যালোচনা ও রেটিং

0 মোট 5.0 -এ
(0 পর্যালোচনা)
এই বইয়ের জন্য এখনও কোন পর্যালোচনা নেই

বই সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা (0)

প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য

অন্যান্য প্রশ্নাবলী

কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি