অগ্নিসত্র
শাল্মলী রায়
ভূমিকা :
"at Benares it was not enough to have smoked glass; the eye of faith was also indispensable" - Aldous Huxley
আমি কখনও ভাবিনি বেনারস আমার জীবনে এমন গভীর, এমন স্থায়ী চিহ্ন রেখে যাবে; বিশেষ করে এমন একজনের জীবনে, যে কোনও দিন পা রাখেনি সেই শহরের মাটিতে। কিন্তু ওই যে হাক্সলে সাহেব বলে গিয়েছিলেন, "eye of faith"; বিশ্বাসী দৃষ্টি আর বিশ্বাস-ই দৃষ্টি। কিছু শহর থাকে, যাদের ভৌগোলিক উপস্থিতি প্রয়োজন হয় না; তারা ঢুকে পড়ে মানুষের কল্পনায়, স্মৃতিতে, স্বপ্নে। বেনারস আমার কাছে তেমনই এক শহর- যাকে আমি দেখিনি, কিন্তু অনুভব করেছি। যে শহরের নাম উচ্চারণ করলেই মনে পড়ে আগুন, ধোঁয়া, মন্ত্র, ঢোল, তবু এক অদ্ভুত নীরবতা, সময় যেখানে থমকে আছে। যেখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে কোনও শক্ত দেওয়াল নেই, আছে শুধু এক পাতলা আলোছায়ার পর্দা, আছে এক মনিকর্ণিকা। এই উপন্যাস লেখার সময় আমি বুঝেছি, গল্প বলার শিক্ষা আমি কোনও লেখালেখির কোর্স থেকে পাইনি; আমি শিখেছি এক অদৃশ্য শহরের কাছ থেকে, যে শহর হাজার হাজার বছর ধরে মানুষকে শিখিয়ে এসেছে- কীভাবে জন্ম আর শেষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্থ খুঁজে নিতে হয়।
বেনারস আমার কাছে কখনও শুধুই একটি জায়গা নয়, বরং এক যাত্রা। আসী ঘাটের ভোর, মণিকর্ণিকার ধোঁয়া, নৌকার তলা ছুঁয়ে ওঠা আলো, সন্ধ্যার আরতির ঢোল, এসব আমি এই জন্মে চোখে দেখিনি, কিন্তু এগুলো আমার কল্পনায় এমনভাবে বাসা বেঁধেছে, যেন বহু জন্মের চেনা দৃশ্য। এগুলো নিছক দৃশ্য নয়, এগুলো এক ধরনের সচেতনতা। এমন এক অনুভূতি, যা লেখার টেবিলে বসালে হঠাৎ মনে করিয়ে দেয়- শহরও একটা চরিত্র হতে পারে। মানুষের মতো তারও স্মৃতি আছে, ক্ষত আছে, অভিশাপ আছে, আবার মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও আছে। 'অগ্নিসত্র'-এ বেনারস তাই পটভূমি নয়; সে নিজে একটি সত্ত্বা। সে শ্বাস নেয়, সে কথা বলে, সে কখনও আশীর্বাদ করে, আবার কখনও নিষ্ঠুরভাবে পরীক্ষা নেয় তার সন্তানদের। আর সেই করে সেই বিশেষ যজ্ঞ যাকে বলা যায়, আত্মাহুতি, সত্র। এই উপন্যাসে বেনারস কাউকে অন্ধ হয়ে থাকতে দেয় না, সে সবাইকে বদলায়।
এই গল্প লেখার সময় আমি বারবার অনুভব করেছি, বেনারস যেন নিজেই আমাকে তার গল্প শোনাচ্ছে। কখনও সে হাজির হয়েছে কালভৈরবের তাণ্ডবের মতো রুক্ষ, ভয়ঙ্কর, আপসহীন। কখনও সে এসেছে গঙ্গার হাওয়ার মতো, নরম, ধীর, আশ্বস্তকারী। আবার কখনও এমন এক অদ্ভুত আলোয় নিজেকে মেলে ধরেছে, যে আলো চোখে পড়ে না, কিন্তু মনকে অন্তর্দৃষ্টি দেয়। তখন মনে হয়েছে, এই শহর তার গোপন ইতিহাস আমাকে ধীরে ধীরে খুলে দিচ্ছে। শর্ত একটাই; আমি যেন তাড়াহুড়ো না করি। বেনারস তার গল্প হুড়োহুড়ি করে বলে না। সে অপেক্ষা করে। সে দেখে কে ধৈর্য ধরে শুনতে পারে, কে শুধু চমক খুঁজছে। অগ্নিসত্র সেই ধৈর্যের ফসল।
এই উপন্যাসের চরিত্ররা, তারা কেউই কেবল মানুষ নয়। তাদের ভেতরে ইতিহাস আছে, পুনর্জন্ম আছে, অপরাধবোধ আছে, আর আছে এমন সব প্রশ্ন, যার উত্তর সহজ নয়। প্রেম এখানে নিরাপদ জায়গা নয়; প্রেম এখানে পরীক্ষার আগুন। বিশ্বাস এখানে হালকা শব্দ নয়; বিশ্বাস এখানে বলি। ক্ষমতা এখানে রাজনীতি নয়; ক্ষমতা এখানে সাধনা। এই গল্পে দেবতা ও মানুষ আলাদা হয়ে থাকে না, তারা একই মঞ্চে হাঁটে, একই আগুনে দাঁড়ায়। কালভৈরব, ধূমাবতী, দুর্গা- এরা কেউ প্রতীক নয়; এরা সময়ের মুখ। আর সেই সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষকে নিজের সত্য স্বীকার করতেই হয়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই সবকিছু লিখতে লিখতে আমি বারবার মনে করেছি, আমি যেন বেনারসকে কল্পনা করছি না; বরং বেনারস আমাকে কল্পনা করছে। আমি যেন শুধু কলম ধরে বসে আছি, আর শহরটি নিজেই তার গল্প লিখে নিচ্ছে আমার হাত দিয়ে। হয়তো এই কারণেই অগ্নিসত্র আমার কাছে শুধু একটি থ্রিলার বা মিথ-নির্ভর উপন্যাস নয়। এটি একটি আত্মিক অভিজ্ঞতা ও যাত্রা, এক এমন শহরের সঙ্গে সংলাপ, যেখানে আমি কখনও যাইনি, কিন্তু যে শহর আমার ভেতরে স্থায়ীভাবে থেকে গেছে। যদি এই বই পড়ে কেউ এক মুহূর্তের জন্যও অনুভব করেন যে শহরও বাঁচে, ভালোবাসে, আর প্রতিশোধ নেয়- তাহলে এই উপন্যাস তার উদ্দেশ্য পূরণ করেছে।
- শাল্মলী রায়
০১.০১.২০২৬
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি