ভ্রান্তি
মালবিকা রায়
(আগামীর কল্প বাস্তব)
কল্পবিজ্ঞান বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা আর কল্পনার মিশেলে তৈরি একটি সাহিত্যধারা। একটিই গল্পকে নিয়ে তিনটি বই — ভ্রান্তি, বিভ্রান্তি এবং ভ্রান্তিবিলোপ।
আমাদের পৃথিবীটা কেমন হতে পারে আরও একটা শতাব্দী পার হয়ে ? সেই কল্পনা থেকেই শুরু হয়েছে মালবিকার লেখা কল্পবিজ্ঞান সিরিজের প্রথম বই 'ভ্রান্তি'।
বইয়ের কিছু অংশ :
“ক্যান্টিন তো এখানে নয় দাদু।”
অ্যালেক্স অবাক।
“তোমার বন্ধুদের কি ক্যাান্টিনে খাওয়ালে চলে? চলো, ক্রায়োজেন ল্যায়বের পাশে আমার যে ঘরটা আছে সেখানে খাবারের ব্যাবস্থা করেছি।”
“কিন্তু ল্যাবে খাবার কী করে—“
“ল্যাবে তো নয়, ল্যাবের পাশে। চলো ওদিকে।”
আবার সবাই মিলে ফিরে এল ওরা ক্রায়োজেন সেন্টারে। প্যাট্রিক ঠিকই বলেছিলেন, ল্যাবের পাশেই একটা বড় ঘর, সুন্দর সাজানো। মনে হয় এটাও ওঁর একটা অফিস। নরম, গদি আঁটা চেয়ারে বসতেই বেশ কয়েকজন লোক এসে বিভিন্ন স্ন্যাকস, পেস্ট্রি, কফি, কোল্ড ড্রিঙ্কস সব ওদের সামনের নীচু টেবিলে রেখে গেল। এতক্ষণ ঘুরে খিদে পেয়েছে সবারই ।
কিন্তু খেতে শুরু করার আগেই বেজে উঠলো প্যাট্রিকের ফোন। উনি দুটো কথা বলেই ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমাকে একটা জরুরি মিটিং-এ যেতে হবে। ভেবো না, তোমরা খাওয়া দাওয়া করো, আমি ঘন্টা খানেকে ফিরে আসবো। এসো অ্যালেক্স।”
“আমি, দাদু? কিন্তু ওরা…?”
“তোমার সই লাগবে একটা ডকুমেন্টে অ্যালেক্স। তোমার বন্ধুদের সঙ্গে তো মিঃ লংবটম রইলেন। এসো আমার সঙ্গে।”
অ্যালেক্স বিরস বদনে বেরিয়ে গেল দাদুর সঙ্গে।
“এই ঘরে কোনো জানলা নেই কেন মিঃ লংবটম?”
মাইক একটা পেস্ট্রি তুলে নিয়ে প্রশ্ন করলো।
“এটার চারিদিকে তো বিভিন্ন ল্যাবের ঘর, সেই জন্য । যাকগে তোমরা একটু বোসো, আমি একটা ফোন সেরে আসছি।”
লংবটম বেরিয়ে যেতেই চি সবে প্লেটে বেশ কয়েকটা পেস্ট্রি তুলেছে, অমনি মাইক বলে উঠল,
“ওগুলো রাখ চি। আমার কিন্তু ব্যাপার ভালো লাগছে না।”
“মানে?”
“ওরা আমাদের একা রেখে এভাবে বেরিয়ে গেল কেন?”
“আরে, আসবে এক্ষুনি।”
“আমাদের কারো কাছে ফোনও তো নেই।”
“কী করে থাকবে? এখানে ঢোকার আগে সব ভিজিটরকেই তো তাদের ফোন জমা রেখে, বডি সার্চ করিয়ে ঢুকতে হয়। হাই সিকিউরিটি এলাকা না এটা?”
এদিকে জয়নাল হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে হাপরের মত নিঃশ্বাস নিচ্ছেন।
“কী হল জয়? ডিড ইউ স্মোক সামথিং ফানি?”
মায়ার প্রশ্নের জবাবে জয় কিছু বলার আগেই মাইক লাফিয়ে উঠল,
“স্মোকিং না। গ্যা স। এই ঘরের ফলস সিলিং-এর পেছনে নিশ্চয়ই ডাক্ট আছে, ল্যাবের থেকে আসা কমন ডাক্ট…”
এবার মায়ার নিঃশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে। চি জোরে জোরে শ্বাস টানছে।
“বোধহয়…অ্যাকসিডেন্টাল লীক।”
হাঁফাতে হাঁফাতেও মায়া বিশ্বাস করতে পারছে না যে প্যাট্রিক দোষী।
“থাম তো মায়া! বুদ্ধি শুদ্ধি কি সব লোপ পেয়েছে তোর? ঘরে আমদের আটকে নিজেরা পালালো, আর এখন গ্যাস লীক।”
মাইক তেড়ে উঠল।
“হালা, ইবলিশের বাচ্চা!”
জয় হাঁপাচ্ছেন।
“কি-কিন্তু কেন? কেন মারবে ওরা আমাদের?”
মায়া জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলে উঠল। ওর মাথাটা হাল্কা লাগছে ক্রমশঃ।
“বিকজ ইটস অল এ সিম্যুলেশন মায়া, লেটস গো…”
মাইক উঠে দরজার কাছে গেল। বন্ধ ওটা বাইরে থেকে।
“গো, কোথায় যাব?”
চি দিশেহারা, কবির চোখ হাঁপানির টানে ফেটে বেরিয়ে আসছে।
মাইকের চোখ দ্রুত ঘরের চারপাশটা স্ক্যাান করছে।
“গারবেজ শ্যুট…ক্যু ইক..”
মাইক এগিয়ে যায় ঘরের অন্য দেওয়ালে গার্বেজ শ্যুট দিয়ে। দেওয়ালের গর্ত দিয়ে বাতিল জিনিস ফেলে দিলে সোজা গিয়ে পড়ে আবর্জনার ঢিপিতে।
এখান দিয়ে মানুষের পক্ষে যাওয়া সোজা নয়। তবু প্রাণের দায় বড় দায়। মায়ার চেহারা পাতলা, চি-ও ছোটখাটো । ওরা আগে গেল । তারপর জয়—সেটা অত সহজ হল না, চেহারা একটু ভারীর দিকে, ফিটনেসও কম—তবু হাঁচড়পাঁচড় করে ঢুকে পড়লেন। সব শেষে মাইক ওর লম্বা, শক্তপোক্ত কাঠামোটা ঢুকিয়ে দিল গার্বেজ শ্যুট দিয়ে।
একটা বাচ্চাদের পার্কে খেলার আঁকাবাঁকা স্লাইডের মতো। মায়া গড়াতে গড়াতেই ভাবছিল ছোটবেলায় এরকম স্লিপারি স্লাইডে ও অনেক খেলেছে। গড়ানে পথ দিয়ে ওরা পর পর এসে পড়ল এ ওর ঘাড়ে। কিন্তু এটা বাইরের কোনো ভ্যাট নয়, এটা ওই সেই সেন্ট্রাল রিসাইক্লিং জায়াগাটা, যেটা ওরা একটু আগেই দেখেছিল। কুয়োর মত জায়গার চারদিকে মসৃণ, ধাতব দেওয়াল। আরো তিন চারটে শ্যুটের মুখ এসে পড়েছে সেখানে। রোবোটিক হাইড্রোলিক প্রেস সব জিনিস এক এক করে নিয়ে ক্রাশ করছে।
“এরেই কয় গরম তেল থেকে তপ্ত কটাহ । এবার? চিঁড়ে চ্যাাপ্টা?”
জয়নাল বলে উঠলেন।
“চেঁচাই আমরা জোরে?”
চি বলে উঠল।
“কী লাভ চি? ওরা তো মারতে চাইছিল আমাদের—“
মায়া বলে উঠল।
“তাহলে? এখানে থাকলেও তো চ্যাপ্টা হয়ে যাব—“
“এদিকে। ক্যুইক।”
মাইক অন্য। একটা গার্বেজ শ্যুটের মুখ দেখিয়ে বলে উঠল।
“কোথায় গেছে এটা? যদি গিয়ে আবার ফিনস্টাইনের খাস কামরায় ওঠে?”
কবি বলে উঠলেন।
“হলে তখন দেখা যাবে। চলুন এখন।”
চি সবার আগে ঢুকে পড়েছে। তারপর বাকি সবাই। এবার ওই পিছল স্লাইড বেয়ে উল্টো বাগে যাত্রাটা মোটেই সোজা হল না। তবু পিছলাতে পিছলাতে, হড়কাতে হড়কাতে সবাই মিলে এসে উপস্থিত হলেন একটা ধাতব ঘরে।
“এটা…এটা তো…”
তোতলানো কবিকে থামিয়ে মাইক বললো,
“এটা ওই রকেটটা । এন এইচ ২৩৯৭।”
ওরা রকেটের গার্বেজ ডিসপোজাল সিস্টেম দিয়ে ভেতরে চলে এসেছে।
“কী করব এবার?”
“আগে এই ভেন্টটা বন্ধ করি।”
মাইক ভারী লোহার গোল দরজাটা বন্ধ করে ম্যাগনেটিক লক এঁটে দিল।
“নাও লেটস গো আপস্টেয়ার্স।”
“আপস্টেয়ার্স?”
“মাইক ঠিক বলেছে। গার্বেজ ডিসপোজাল ভেন্ট রকেটের সবচেয়ে নীচের তলায় থাকে। ককপিট নিশ্চয়ই ওপরে। চল।”
চি এসব ব্যাপার জানে ভালো।
লোহার মই বেয়ে, মাথার ওপর লোহার গোল ঢাকনা খুলে ওরা ওপরের চেম্বারে এল। এই ককপিটটা থেকে ওরা একটু আগেই ঘুরে গেছে। তখন এই পথে না, এসেছিল মেইন দরজা দিয়ে। সামনের কাঁচের মধ্যেক দিয়ে দেখতে পাচ্ছে জেনারেল মিয়াজিকির লোকেরা ছুটোছুটি করছে।
“ওরা খবর পেয়ে গেছে।”
মাইক শান্ত স্বরে বলল।
“তাহলে?”
“চি, চালাতে পারবি এটা? সব তো সেট করাই আছে?”
“আ-আমি? আমার পরীক্ষা হয়নি এখনো…সোলো চালাইনি কখনো…”
“শুধু দুটো ক্লাস বাকি তো! তুই একমাত্র ভরসা চি । কনট্রোল প্যানেলটা দ্যােখ, পারবি চালাতে…”
“কিন্তু চালিয়ে কোথায় যাব? মহাকাশে? আমাদের স্পেস স্যুট নেই, কারো অ্যাাস্ট্রোনটের ট্রেনিং নেই, জিরো গ্র্যাোভিটিতে কি করে সারভাইভ করব?”
“জানি না চি। যেখানে হোক চল। এনিহোয়্যার ইজ বেটার দ্যান হিয়ার। ওই দ্যাখ নীচে।”
ওরা দেখল ককপিটের জানলা দিয়ে, রকেট ঘিরে ফেলছে ওরা।
চি মরিয়া হয়ে কনট্রোল প্যাানেল দেখে বিভিন্ন বাটন টিপতে লাগল। একটু পরেই দুলে উঠলো রকেট।
“স্টপ ইট, ইউ কান্ট এসকেপ।”
হঠাৎ ভয়েস সিস্টেমে ফিনস্টাইনের গলা, টিভি স্ক্রিনে ওঁর মুখ।
“তোমরা পালাতে গেলেই মরবে। তার চেয়ে ঢুকতে দাও আমাদের, কোনো ক্ষতি হবে না তোমাদের কথা দিচ্ছি—“
ফিনস্টাইনের কথা শেষ হবার আগেই স্পেসশিপ টেক অফ করেছে । আনাড়ি পাইলট চি যে কোথায় যাচ্ছে কেউ জানে না। আপাততঃ রকেট যাচ্ছে সোজা ঊর্ধ্বপানে। নীচের মাটি দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে।
“ওরা যদি প্লেন নিয়ে তাড়া করে?”
“সেই জন্যই ওপরে যাচ্ছি সোজা, প্লেন আসতে পারবে না। এমনিতেই এই গ্রহে প্লেন অনেক নীচু দিয়ে যায়।”
চি মন দিয়েছে প্যানেলে।
হঠাৎ অন্য পাশের গোল দরজায় দুমদুম আওয়াজ । ওরা সচকিত। কেউ কি ছিল নাকি স্পেসশিপে? ভাবতে ভাবতেই আবার আওয়াজ । মাইক আস্তে আস্তে এগিয়ে দিয়ে দরজাটা খুললো। অ্যালেক্স!
“অ্যালেক্স? তুমি এখানে?”
“আমার ঘড়িটা তখন এখানে ফেলে গেছিলাম, সেটা নিতে এসেছিলাম…কিন্তু এসব কি? চি, তুমি শিপ কেন চালাচ্ছ? দাদু জানলে কিন্তু…”
“চুপ! তোমার দাদু খুন করতে চাইছিল আমাদের।”
“হোয়াট ননসেন্স…”
“ওঃ, ওঃ…ওঃ মাই গড…”
চি চেঁচিয়ে উঠেছে। ওর আঙুল সামনের জানলার দিকে। জানলা দিয়ে নীলচে বেগুনি আকাশ আর সূর্যের বদলে ভেসে উঠছে একটা এবড়ো খেবড়ো, পাথুরে ছাত। রকেট ছুটে চলেছে সেইদিকে।
“সিমুলেশন, ইটস অল এ সিমুলেশন ।”
মাইক বিড়বিড় করে।
“ওরা…ওরা…সব মিথ্যে বলেছে এতদিন। সব্বাইকে। এটা সত্যি আকাশ নয়, প্ল্যাানেটারিয়ামের আকাশ।”
মায়া বলে উঠলো।
“ইয়েস…উই আর লিভিং ইন এ সিমুলেটেড রিয়ালিটি…লাইক মেট্রিক্স। ওই গ্রহণ…ইট ওয়াজ এ গ্লিচ ইন দ্যট মেট্রিক্স…মেশিনটা গড়বড় করছিল হয়তো সেদিন…”
মাইক বলে চলল।
“আমরা…আমরা সবাই আসলে …গুহার মধ্যেত…ও মাই গড!”
চি বলে উঠলো। গুহার পাথুরে ছাত এখন আরো কাছে।
সবাই বিস্ফারিত চোখে দেখছে গুহার ছাত এগিয়ে আসছে সামনে। ধাক্কা লাগলে এই রকেট সহ সবাই তালগোল পাকিয়ে যাবে।
কবি বিড়বিড় করেন, “মায়া, মায়া, সব মায়া…মায়ার খেলা।”
(বাকিটা বইয়ের পাতায়)
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি