দণ্ডনীতি
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
'একটি রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের কী প্রকৃতি হতে পারে তার নমুনা দেখাতে গিয়ে কৌটিল্য দ্বৈরাজ্য, বৈরাজ্য এবং সংঘরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করেছেন বটে, তবে এই প্রত্যেকটি শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর যুক্তি-তর্কগুলি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, এগুলি অন্তত তাঁর ঈপ্সিত কোনো শাসনতন্ত্র নয়। একটি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এককেন্দ্রিক বিষয় হিসেবে রাজতন্ত্রই যে কৌটিল্যের একমাত্র পছন্দের জিনিস, সেটা তাঁর অর্থশাস্ত্র থেকে বহুলভাবে প্রমাণ করা যায়।
কোনো সন্দেহ নেই যে, পশ্চিমি তাত্ত্বিকদের মতো কৌটিল্য রাষ্ট্রের কোনো সংজ্ঞা নির্ধারণ করেননি। তার কারণও আছে। সবচেয়ে বড় কারণ-কৌটিল্য নিজে কোনো তাত্ত্বিক নন এবং তাত্ত্বিকতা তাঁর খুব পছন্দের জিনিসও নয়। বাস্তব ক্ষেত্রে, চূড়ান্ত ক্ষমতাশালী এক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যগ্রতাতেই যেহেতু অর্থশাস্ত্র লেখা হয়েছে, তাই রাষ্ট্রের সংজ্ঞার চেয়েও রাষ্ট্রের প্রয়োজন এবং পরিচালনা নিয়েই কৌটিল্য মাথা ঘামিয়েছেন বেশি। তাই বলে আধুনিক ভাবনার তাত্ত্বিকতা মেশানো কি কিছুই নেই কৌটিল্যে? আছে। সামান্য হলেও আছে। যেমন কৌটিল্য বলেছেন-রাজ্য আসলে রাজ্যের মানুষগুলি। মানুষ না থাকলে রাজ্যের কোনো মূল্য নেই-পুরুষবদ্ধি রাজ্যম্। অপুরুষা গৌর্বন্যেব কিং দুহেত। আবার অন্যত্র বলেছেন-জন ছাড়া জনপদ হয় না, রাজ্যও হয় না-ন হ্যাজনো জনপদো রাজ্যং জনপদং বা ভবিতুমর্হতি।
রাষ্ট্র বলতে যে একটি নির্দিষ্ট জনপদ এবং সেই জনপদভুক্ত মনুষ্যগুলিকে বোঝায়, সে কথা একটি সংজ্ঞার মতো করে না বললেও অর্থশাস্ত্রের নানা আলোচনা থেকে তা বোঝা যায়। বিশেষত, কৌটিল্য যখন অর্থশাস্ত্রের সংজ্ঞাতেই 'মনুষ্যবতী ভূমি'র কথা উল্লেখ করেন, তখনই যেন আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞা কৌটিল্যের বক্তব্যের মধ্যে নিহিত হয়। কৌটিল্যের ভাবনায় একটি রাষ্ট্রের আয়তন কী হতে পারে তা সঠিকভাবে উচ্চারণ করা আমাদের পক্ষে কঠিন। পণ্ডিতেরা মনে করেন-কৌটিল্য যে রাষ্ট্রের কল্পনা করেছেন তার আয়তন খুব বড় হতে পারে না।' তার একটা বড় কারণ হল-একটি রাজ্যের আশেপাশে, সামনে-পিছনে যে রাজমণ্ডলের কথা কৌটিল্য লিখেছেন, তার সংখ্যা অন্তত বারোটি হওয়ায় পণ্ডিতেরা মনে করেন-যে রাজ্যে আগে-পরে কমপক্ষে বারোটা রাজ্য আছে, সে রাষ্ট্রের আয়তন খুব বিরাট হতে পারে না।
সত্যি কথা বলতে কী, সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে একটি সাম্রাজ্য যদি কল্পনা করা যায়, তবে কৌটিল্য তাঁর নাম দিয়েছেন 'চক্রবর্তিক্ষেত্র'। তবে সমগ্র ভারতবর্ষে একটি চক্রবর্তী রাজার অধিকার কল্পনা করা যে মোটেই বাস্তবসম্মত নয়, সেটা কৌটিল্য বুঝেছিলেন। অন্যদিকে, একটি অধিকৃত রাজ্যের আগে-পরে শত্রু-মিত্র মিলে যে দ্বাদশ রাজমণ্ডলের কল্পনা করা হয়েছে, তাতেই কৌটিল্যের অভীষ্ট রাজ্যটুকু খুব ছোট হয়ে যাবে, সেটাও ধারণা করা ঠিক হবে না। বরঞ্চ এই রাজমণ্ডলের নিরিখেই কৌটিল্যের অভীষ্ট রাজ্যটিকে সাধারণের তুলনায় একটু বড়ই ভাবা উচিত।..'
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি