গহনকুসুম
হৈমন্তী ভট্টাচার্য
প্রচ্ছদ - ঋতুপর্ণা খাটুয়া
পৌরাণিক প্রেম হোক কিংবা আধুনিক সময়ের প্রেম—উভয়ের গভীরে নিহিত থাকে সেই একই চিরন্তন অনুভব, আকর্ষণ, আবেগ এবং আত্মিক সংযোগের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। কালের আবর্তনে চরিত্র বদলায়, প্রেক্ষাপট রূপ নেয় ভিন্ন আঙ্গিকে; কিন্তু প্রেমের মূল সুর থেকে যায় অমলিন, অপরিবর্তিত।
কিছু সুবিদিত প্রেমকাহিনির বাইরে, ভারতীয় বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যানের অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে আরও কত অচেনা চরিত্র—যাঁদের প্রেম ছিল নিঃশব্দ বিরহে মোড়া, ত্যাগে দীপ্ত, আত্মা ও পরমাত্মার অন্তর্লীন মিলনে পরিপূর্ণ। সে প্রেম কখনও উচ্চারিত হয়েছে, আবার কখনও হয়নি, তবু যুগযুগান্তর ধরে নীরবে প্রবাহিত হয়েছে মানবচেতনার গভীরে।
সেরকমই কিছু পৌরাণিক কাহিনীর বিনির্মাণ 'গহনকুসুম'এ স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে এমন কিছু কাহিনী, যাতে প্রেম এসেছে আজকের ভাষায় 'নিষিদ্ধ' পথে। আমরা 'মাতৃকাম', গ্রীক নাটকে ইদিপাসের জন্মদাত্রীর প্রতি আকর্ষণ পড়ে চমকে উঠি। ইদিপাস কিন্তু জানতেন না যে তাঁর অঙ্কশায়িনী , স্বয়ং তাঁর জননী। জানার পর তিনি আপন ইন্দ্রিয়ের প্রতি ধিক্কারে অন্ধত্ব বরণ করে নেন। কিন্তু আমাদের পুরাণে এমন কাহিনী আছে, যেখানে মাতৃরূপে পূজনীয়া নারীকে পুরুষ সপ্রেমে গ্রহণ করেছেন। বাৎসল্য বদলে গেছে প্রেমে। এবং তা গৃহীতও হয়েছে স্বীকৃতির স্মিতহাস্যে।
হ্যাঁ, এতখানি এগিয়ে ছক ভেঙে ভাবার ক্ষমতা আমাদের প্রাচীন কবিদের ছিল। দৈব, পূর্বজন্মের বিধান এসব দিয়ে জোড়াতাপ্পি দিতে হয়ত তাঁদের হয়েছিল যুগের চাহিদা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা মাথায় রেখে। কিন্তু নিশ্চয়ই তাঁরা এমনটা কল্পনা করতে পেরেছিলেন তাদের মানসিক ঔদার্য্যের গুণেই।
এরকম ধরণের পাঁচটি চমৎকারিত্বে ভরা পৌরাণিক কাহিনী, বলা ভালো প্রেমকেন্দ্রিক কাহিনী এই বইতে আছে।
বইটির অপর অংশে আছে আজকালের বাস্তব জীবনে গড়ে ওঠা মানবিক আকর্ষণ বিকর্ষণ সঞ্জাত পাঁচটি প্রেমের গল্প। বলা যায় অপ্রচলিত প্রেমের গল্প। সমাজের চোখে নিষিদ্ধ , অজাচার বলে নিন্দিত প্রেমের গল্প। তাতে কোনটি কিছুটা থ্রিলারধর্মী, কোনওটি আবার ইতিহাসের কোনও সময় ছুঁয়ে থাকা। কোনওটি একেবারে অন্ত্যজ জীবনের।
দশটি গল্পের, প্রত্যেকটি গল্পে প্রেম শরীর মন জুড়ে রয়েছে। যাঁরা পিউরিটান, আমাদের মনে হয় তাঁরাও প্রেমের ক্ষেত্রে শরীরের কোনও ভূমিকা নেই, থাকা উচিত নয় তা মনে করেন না। মিলনের সেই বর্ণনা শব্দে ব্যঞ্জনায় সুন্দর করে তোলাই শিল্পীর লক্ষ্য। আমিও সেই চেষ্টা করেছি।
তবে দেহ ছড়িয়ে মন, "প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর", ছাড়িয়ে "হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে/ পরান পিরিতি লাগি থির নাহি বান্ধে"-র উত্তরণই আমাদের মতে প্রেম।
'গহনকুসুম 'তাই নিছক প্রেমের গল্প নয়, ছক ভাঙা প্রেমের গল্প। দশটি গল্পেরই স্থায়ী ভাব প্রেম।