নগর-সংকীর্তন থেকে অঙ্গনমঞ্চ
নীলাঞ্জন হালদার
বাদল সরকারের নাট্যদর্শনকে কেবল পাশ্চাত্যের গ্রোটোভস্কি বা ব্রেখটের লেন্স দিয়ে বিচার করা ভুল হবে। তিনি অবশ্যই তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, কিন্তু তাঁর আত্তীকরণ ছিল সম্পূর্ণ দেশজ। তিনি বাংলার মাটির নিচে চাপা পড়া সুপ্রাচীন এক জ্ঞানতত্ত্বকে খুঁড়ে বের করেছিলেন। শ্রীচৈতন্যদেব যে ‘আচরণাত্মক জ্ঞানতত্ত্ব’ (Performative Epistemology) বা ‘দেহজ জ্ঞান’-এর সূচনা করেছিলেন—যেখানে সত্যকে কেবল বুদ্ধি দিয়ে নয়, শরীর ও আবেগ দিয়ে ‘আস্বাদন’ (Relishing/Rasa) করতে হয়—বাদল সরকার বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই ধারাটিকেই পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। চৈতন্যদেব চেয়েছিলেন ভক্তের চিত্তশুদ্ধি, আর বাদল সরকার চেয়েছিলেন দর্শকের ‘চেতনা’ বা কনশাসনেস-এর জাগরণ। উভয়েরই লক্ষ্য ছিল রূপান্তর (Transformation)। একজনের পথ ছিল ভক্তি, অন্যজনের পথ ছিল বিপ্লব। কিন্তু পদ্ধতিটি ছিল এক—মানুষের কাছে যাওয়া, মানুষের শরীরকে মাধ্যম করা এবং ভেদাভেদের দেয়াল ভেঙে এক মহামানবের মিলনক্ষেত্র তৈরি করা। তাই বাদল সরকারের থিয়েটার চর্চা আসলে এক ‘রাজনৈতিক সংকীর্তন’, যেখানে খোল-করতালের বদলে বাজে শ্রমজীবী মানুষের হৃদস্পন্দন, আর হরিনামের বদলে উচ্চারিত হয় মুক্তির স্লোগান। এই সেক্যুলার বা ইহজাগতিক প্রয়োগের মাধ্যমেই ‘অচিন্ত্য ভেদাভেদ’ তত্ত্বটি মধ্যযুগীয় ধর্মতত্ত্বের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছে আধুনিক সমাজবদলের এক শক্তিশালী দার্শনিক হাতিয়ার।
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি