সে কি রয়ে গেল গো
আবীর মুখোপাধ্যায়
নিছক অনিকেত নয়, এই ভুবনগ্রামে, সব ঘটনার একটি প্রেক্ষিত থাকে। সবের একটা সম্ভাবনাময়, পরম্পরাগত পূর্ব ইঙ্গিত থাকে। সে জীবন হোক— উপন্যাসের কাহিনি— স্বপ্নের মোহিনী বাঁক হোক! এ কাহিনিরও স্তরে স্তরে, ছিল নিরুদ্দেশের ইঙ্গিত। সে ছিল— সেই নেই। চলে যে যাবে; তার এবং অপার হয়ে বসে থাকার; ঠিকানাবিহীন তার।
সেই কবে চলে গেছে সে! দরোজা হাট খোলা... পল্লির নিঃসঙ্গ হাওয়া ফিরে ফিরে, এখনও জানান দেয় যে, সে নেই...! স্মৃতি কী নিদারুণ, নির্দয় সেই হাওয়ার রটনা। স্মৃতিময় সারাবেলা, সারা সারা বেলা— গোখরো সাপের মতো ভয়াল স্মৃতির নির্দয় ছোবল— ড্রয়ারে ভাঙা ক্লিপ, ফুরিয়ে আসা লিপস্টিক, পড়ার টেবিলে লুকানো খাতার পাতায় ডুডলস্, শ্রীপান্থ’র বইয়ের মার্জিনে পেনসিলে তার মন্তব্য, তার শাড়ি, তার জিন্স-তার গোপন রাত্রিবাস, তার... তার... শরীরের মউ গন্ধ— সারা ফ্ল্যাটবাড়ি জুড়ে এখনও সে!
সবখানে সে আছে। অথচ সে নেই!
এই স্মৃতিসম্পুট সংকেতমালা নিয়ত আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় ‘অপেক্ষা একটি নদীর নাম’। জীবন থেকে চিত্রিত কাহিনির আরোহণ ছিল সেখানে। ক্রমে আলাপ থেকে বিস্তার, এই শেষ পর্বে রইল—বান্দিশ, তান-তোড়-তারানা!
কখনও রাগ ভৈরবী— তখন পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু ঝরে জল! কখনও ইমনকল্যাণ— সে কি রয়ে গেল গো। লক্ষ্মীর চলে যাওয়া এবং অবনীর একলাযাপন, একসময় উন্মাদের পাঠক্রম রচনা করে। কারুবাসনার নির্বাসন থেকে অবনীর ফেরা আর হয় না! তার মতিচ্ছন্নময় জীবনের জন্য, এ চরাচরে জেগে থাকে শুধুমাত্র একজন। সে তার ভিতরের অবনী। সে বলে, তুমি যখন ঘুমাও, চুপি চুপি এসে আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিই। চাদর টেনে দিই। যখন, মধ্যরাত্তিরে তোমার জ্বর আসে, এই আমি— তোমার ভিতরের আমি, তোমার মাথায় জলপট্টি দিই। জ্বর... জ্বর... ওই জ্বর এল। কাঁপন, জ্বরের কপালে শব্দের করস্পর্শ!
লক্ষ্মী আর অবনীর শেষকথা চিত্রিত করতে গিয়ে এ কাহিনির বাঁক-উপবাঁকে, মিলেমিশে গেছে ব্যক্তিগত উচ্চারণ। সকরুণ সুরে সুরে, মর্মদাহ নিয়ে! লেখার সঙ্গে মিলেমিশে গেছে বন্ধুজনের ভালবাসা!