বাবা
নয়ন বসু
বাবা কেমন হয়? সুপারম্যান? সন্তান চাইলেই উড়ে গিয়ে চাঁদের টুকরো পেড়ে আনতে পারেন? অন্তর্যামী? ঈশ্বরের মতন? মাছের কাঁটা বাছতে গিয়ে অন্যমনস্ক দেখলে বুঝে যাবেন আজ তাঁর সন্তানের মন খারাপ? রাতে ঘুমাবার আগে মাথায় হাত বুলিয়ে বলবেন, “এই, কীরে! দেখছিস না আমি আছি! কিচ্ছু হয়নি!” আর সন্তানের চোখ দিয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পড়বে চাঁদের টুকরো! কেমন রূপকথার মতো, না? কিন্তু আসলে বাবারা তো আর সত্যি সত্যি সুপারম্যান হন না। অন্তর্যামীও হন না। সর্বশক্তিমানও হন না। বাবাও তো রক্তমাংসের মানুষ। লজ্জা ভয় রাগ হতাশা, আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই সবই একজন বাবাকেও কুরে কুরে খায়। মায়ের হাতে মার খেতে দেখলে চুপচাপ গম্ভীর মুখে ঘর থেকে উঠে চলে যায়, অফিস কলিগের ছেলে নিজের সন্তানের থেকে বেশি নম্বর পেলে মুখ গোমড়া হয়ে যায়, স্কুলের বন্ধুর বাবা জন্মদিনে গ্রেট ইস্টার্নের কেক আনলে মঞ্জিনিস পর্যন্ত দৌড়ন মানুষটার বুকের মধ্যেও ক্ষরণ হয়। বাবা তো। সমাজের আর পাঁচটা ভীতু মধ্যবিত্ত মানুষটার মতোই। আলাদা নয়। এইসব চোরাবালিতে কেটেছড়ে যাওয়া মানুষটা, সদ্যজাত সন্তানের মাথার দুধ দুধ গন্ধ নেওয়া অতীন্দ্রিয় সুখগ্রস্ত মানুষটা যদি হঠাৎ করে জানতে পারে তার চাকরি চলে গেছে? ঘরে দুটো বাচ্চা, একজন এই বছর মাধ্যমিক দেবে, আরেকজন সবে ক্লাস টু, কেমন লাগতে পারে সুপারম্যানের? তার মাথার ওপর তো আর কোনো বলিষ্ঠ অন্তর্যামী নেই, তার জীবনে কোনো সান্টা ক্লজ নেই যে অলীক মোজার মধ্যে চিরকুটে লিখে পাঠাবে অমুক ব্যাংকে এতো টাকা রাখা আছে দাদুভাই দিদিভাইদের জন্য, কোনো চিন্তা নেই। নাহ্, বাবা গল্পে কোনো অলৌকিক হয়নি, হঠাৎ করে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে একজন মানুষ অতিমানব হয়ে ওঠেননি। তিনি উঠেছেন, পড়েছেন, কেঁদেছেন, হেসেছেন, কষ্ট পেয়েছেন, দিশেহারা হয়েছেন, ঠিক আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই। যেখানে গ্র্যান্ড জেসচারের মতো কোনো তাজমহল নেই, যা চাই সব পাইয়ের অপচয় নেই, কোনো অতিমানবিক প্রতিভার বিচ্ছুরণ নেই, যা আছে, সেটুকু মৃদু, ভীতু একটা মানুষের নিজের খুদকুঁড়ো গুছিয়ে নেওয়ার, নেওয়ার চেষ্টা করার একটা গ্ল্যামারবিহীন আটপৌরে ইনসিকিউরিটিতে ভরপুর একটা গল্প। ওই গল্পটা আমার আপনার, আমাদের সবার। এই গল্পগুলোই আমরা দেখি, রোজ, ঘুমচোখ খুলে চোখে জলের ঝাপটা দিতে দিতে, নাকেমুখে গুঁজে অফিস ছুটতে ছুটতে, অফিস থেকে ফিরে আবার নুন আর হলুদগুঁড়ো আনতে ছুটতে, সন্তানের অবাধ্যতায় দুঃখ পেতে, ভয় পেতে, আঁকড়ে ধরতে আর এগুলোর কোথাও কোনো জ্যোৎস্না নেই। তাই বাজারের ব্যাগ হাতে যে লোকটা রোজ চারাপোনা খুঁজে বেড়ায়, সে নিজেও জানে না, সে নিজেই একটা কবিতা হয়ে যায়। ভাঙতে ভাঙতে, গড়তে গড়তে, ভেঙে পড়তে পড়তে, উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে। কী আর করবে, বাবা তো!
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি