খানা জানা-অজানা : ইতিহাসের স্বাদ, স্বাদের ইতিহাস

(0 পর্যালোচনা)
লিখেছেন/সম্পাদনা করেছেন
নীলাঞ্জন হাজরা
প্রকাশক সৃষ্টিসুখ

মূল্য
₹599.00
পরিমাণ
মোট দাম
শেয়ার করুন

খানা জানা-অজানা : ইতিহাসের স্বাদ, স্বাদের ইতিহাস 

নীলাঞ্জন হাজরা 

রাজকুমার খুররম, যিনি কিনা কিছু বছর পরেই হবেন সরজ়মিন-এ-হিন্দের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, শাহজাহান বাদশাহ, নিজের তলোয়ার দিয়ে, হয়তো বা উবু হয়ে বসে, গলদঘর্ম হয়ে, অতিকায় এক মাছ কুটছেন— আঁশ ছাড়িয়ে পিস পিস করছেন। বাক্যটা পড়া ইস্তক দৃশ্যটা কল্পনা করে মনে মনে হাসি থামাতে পারছি না। ভাবছেন এ আবার কি আহাম্মুকে কল্পনা? কল্পনা নয়। বর্ণে বর্ণে সত্যি। হিন্দের বাদশাহের সবথেকে প্রিয় রাজকুমারকে সেদিন নিজের তলোয়ার দিয়েই মাছ কুটতে হয়েছিল— বাপের হুকুমে! তিনি একাই নন, কোমরবন্ধ্‌ থেকে নিজ নিজ তলোয়ার, ছোরা খুলে নিয়ে এ কাজে নেমে পড়তে হয়েছিল সেদিন বাদশাহের এন্টুরাজে তাঁর অন্দরমহলের খাস সঙ্গী প্রত্যেক ডাকসাইটে আমিরকে। এই না হলে বাদশাহি হুকুম! সেদিন? ৯ এপ্রিল, ১৬১৮। 

দুরন্ত সে বর্ণনা জাহাঙ্গির বাদশাহ স্বয়ং লিখে গিয়েছেন তাঁর দুরন্ত স্মৃতিকথা জাহাঙ্গিরনামায়। আহমেদাবাদের পথে রওনা হয়ে ৫ এপ্রিল গুজরাটের সেহরা পরগনার একরত্তি জনপদ বাদারওয়ালার ঠিক বাইরে শিবির ফেলার বাসনা করেছেন আলম পনাহ্ অস্‌-সুলতান-উল-আজ়ম জন্নত মকানি নুর-উদ্দিন মহম্মদ সালিম জাহাঙ্গির। কাজেই সেখানেই ধাক্কাধাক্কি করে থেমে গেছে হাজার হাজার হাতি-ঘোড়া-উট-গোরু-বলদে টানা গাড়ি, পালকি, পদাতিকদের বাদশাহি মহাকারোয়াঁ।  M

দূরদূরান্তের নানা জনপদ থেকে হামলে পড়ে সে দৃশ্য বিস্ফারিত চোখে শুষে নেওয়ার চেষ্টা করছে স্থানীয় মানুষ। আদুড় গায়ে শিশুর দল। ইয়া পাগড়ি আর মলিন আটহাতি ধুতি পরা চাষাভুষোর দল। বলদ গাড়ির পর বলদ গাড়ির ঠেলাঠেলি লাগিয়ে আশেপাশের শহরের লালাদের দল— সঙ্গে হরেক কিসিমের উপঢৌকন, যদি কয়েকমুহূর্তের বাদশাহি সকাশে তাঁর পায়ের কাছে সেসব রেখে নিজের নামটা তাঁর কানে ধরিয়ে দেওয়া যায়। উপহার পছন্দ হলে, হাত ঝেড়ে পালটা নজ়রানায় যা দেবেন বাদশাহ তাতে নাতিপুতির ভবিষ্যৎ মজবুত হয়ে যাবে। সেই ভিড়কে বাদশাহি কারোয়াঁ থেকে দূরে রাখতে সাংঘাতিক হুংকার পেড়ে চাবুক হাঁকড়াচ্ছে সান্ত্রির দল।

শিবির পড়ল। আহা বসন্তকাল। নিজের কলমে লিখছেন জাহাঙ্গির, “এইখানে শোনা গেল কোকিলের ডাক। কোকিল পাখিটা অনেকটা কাকের মতো, তবে ছোটো। কাকের চোখ কালো, কোকিলের লাল। মাদির গায়ে সাদা বুটি বুটি, মদ্দা ঘোর কালো। মদ্দার গলা বড়ো সুরেলা, মাদির থেকে এক্কেবারে আলাদা। কোকিল সত্যিই হিন্দের বুলবুল…।” 

শিবির পড়েছে মাহি নদীর মনোরম কিনারে। “আমরা থামলাম মাহি নদীর পাড়ে। আর বিষ্যুদবারের মৌজমস্তি হল হারেমে। নদীর পাড়ে দুটো পুকুর রয়েছে, তাদের জল এমন টলটলে যে তাতে একটা পোস্তদানা ফেলে দিলেও তা পরিষ্কার দেখা যাবে। গোটা দিনটা কাটল হারেমের জেনানাদের সংসর্গে। জায়গাটা এতই মনোরম যে আমি দুটো পুকুরের পাড়েই মাচা তৈরি করার হুকুম দিলাম।” 

এরপরেই সেই বিচিত্র দৃশ্যের দিন। “শুক্রবার, ৯ এপ্রিল আমরা মাহি নদীতে মাছ ধরতে বেরোলাম। জালে বেশ কয়েকটা আঁশওয়ালা বড়ো বড়ো মাছ পড়ল। পুত্র শাহজাহানকে হুকুম করলাম সেগুলোর ওপর তার তলোয়ারের ধার পরীক্ষা করে দেখতে। তার পরে আমিরদেরও হুকুম করলাম কোমরবন্ধের ফলাগুলো বের করে চালাতে। আমার পুত্রের তলোয়ারই সবথেকে ভালো কুটল। উপস্থিত সকলের মধ্যে সেসব মাছ ভাগাভাগি করে দেওয়া হল।” 

এ অবধি পড়ে এমনটা মনে করা অস্বাভাবিক নয় যে, আরে মশাই, রুই মাছের কালিয়া রেঁধেছেন, বেশ করেছেন। তাতে এত কিস্‌সা কাহিনির কী আছে? ব্যাপার হচ্ছে এই, যে কেতাব থেকে এই রেসিপি নেওয়া সেই নুসখা-ই-শাহ জাহানি এবং ‘জাহাঙ্গিরনামা’ নামক দুরন্ত কেতাবটি আমার মন থেকে একটা ধারণা চিরকালের মতো ঘুচিয়ে দিয়েছে— মোগলাই খানা মানেই কাঁড়ি কাঁড়ি মাংস। কাবাব-কষা-কোফতা-কালিয়া সবেতেই গোস্ত। বিলকুল ভুল। শাকসবজি তো বটেই, মুঘলরা ছিলেন রীতিমতো মৎস্যপ্রেমিক।

------------------

নীলাঞ্জন হাজরার 'খানা জানা-অজানা' বইটির খানা ৬ হল কালিয়েহ্‌ মাহি রহু (রুই মাছের কালিয়া)। বইটি খাবারের ইতিহাস আর রেসিপি মিলিয়ে দুরন্ত এক পাঠ অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে পাঠকদের। 

পর্যালোচনা ও রেটিং

0 মোট 5.0 -এ
(0 পর্যালোচনা)
এই বইয়ের জন্য এখনও কোন পর্যালোচনা নেই

বই সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা (0)

প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য

অন্যান্য প্রশ্নাবলী

কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি