একান্নপীঠ

(0 পর্যালোচনা)
লিখেছেন/সম্পাদনা করেছেন
পূর্বা সেনগুপ্ত

মূল্য
₹300.00
ক্লাব পয়েন্ট: 5
পরিমাণ
মোট দাম
শেয়ার করুন
একান্নপীঠ 

পূর্বা সেনগুপ্ত 

"পৃথিবীর সমস্ত আনন্দের উৎস বোধহয় 'মা' শব্দের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। যে অবলম্বনকে কেন্দ্র করে প্রতিটি জীব একটু একটু করে পরিপুষ্ট হয় সেই সৃষ্টির ভাণ্ডার, স্নেহের সাগর হল মা। সতীর দেহছিন্ন একান্নটি পীঠ মূলত মাতৃপীঠ রূপেই পূজিতা। এই মাতৃপীঠগুলির মাহাত্মা, মহত্ত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করার আগে আমি একটি পরিবারের মাতৃসাধনার ইতিহাস নিয়ে। আলোচনা করতে চাই।

অধুনা বালাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া অঞ্চলে এক শাক্ত পরিবার বসবাস করতেন। ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে যে তান্ত্রিক ভাবধারা ও সাধনা বাংলাদেশে প্রসারলাভ করেছিল সেই ভাবধারায় এই পরিবারটিও প্রভাবিত হয়েছিল। বাড়ির পিছনে তন্ত্রসাধনার জন্য পাঁচটি পবিত্র বৃক্ষ দিয়ে পঞ্চবটী প্রস্তুত হয়েছিল, গৃহে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন অসিমুণ্ডমালাধারিণী দেবী কালিকা। কিন্তু এই মাতৃ-আরাধনাই পরিবারে অভিশাপ ডেকে এনেছিল। বিচিত্র সে এক কাহিনী। যদিও কালের গতিতে পরিবারের বর্তমান সদস্যদের কাছ থেকে সঠিক নাম হারিয়ে গিয়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে বৃহৎ পরিবারের পারিবারিক বন্ধন তবুও কাহিনীর কিছু স্মৃতি আজও তাঁদের মধ্যে ঘোরাফেরা করে।

ভারতে তখন বৃটিশ যুগ। কোটালিপাড়ার এই পরিবারের এক সদস্য ছিলেন তন্ত্রসাধক, তিনি ছিলেন বীরাচারী। সুতরাং বিবাহ করেন নি। কিন্তু কিছুদিন পরে হঠাৎ কোনো অজানা কারণে সাধকটি বিবাহের জন্য উন্মত্ত হলেন। দেওরের বিয়েতে মত হয়েছে দেখে গৃহের গৃহবধূ সেই ইচ্ছার আগুনে ধুনো দিলেন এবং দ্রুত নিজের সহোদরার সঙ্গে বিয়ের বন্দোবস্ত পাকা করে ফেললেন। বিবাহের দিন স্থির। বৈবাহিকগণ নিয়মিত যাতায়াত করছেন-কিন্তু তার মধ্যেই পরিবারে নানা অঘটন ঘটতে শুরু করেছে। পরিবারের বিভিন্নজন স্বপ্ন দেখছেন, গৃহে প্রতিষ্ঠিত দেবী রোষায়িত চক্ষে বলছেন, 'ওকে বিয়ে করতে বারণ কর, নইলে সর্বনাশ হবে।' স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু যাঁর বিয়ে-তিনি এই স্বপ্নের কথা শুনে আরও বেশী উৎসাহী হয়ে পড়েছেন যেন দেবীর সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্বের সম্পর্ক চলছে।

সকলের মনের মধ্যে কাঁটার মত বিপদের আশঙ্কা বিঁধে থাকলেও সাধকের উৎসাহের জোরে কেউ আর বিবাহে বাধা দিলেন না। কিন্তু অঘটন ঘটল ঠিক বিয়ের আগের দিন। উৎসবের রোশনাই-এর তখন সবেমাত্র সূচনা হয়েছে। পাত্রীপক্ষের দূত খবর বয়ে আনল, হঠাৎই বিয়ের কনে মারা গিয়েছেন। সুস্থ মানুষটিকে কয়েক ঘণ্টার ভেদবমিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়েছে। খবরটি মুহূর্তের মধ্যে উৎসবের বাড়ি স্তব্ধ করে দিল। কনের মৃত্যুর খবর শুনে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন সাধক। চীৎকার করে দেবীর উদ্দেশে বলে উঠলেন, 'কী, তুই আমাকে বিয়েও করতে দিবি না, আজ তোর খাঁড়া দিয়েই তোকেই বধ করব।'- এই বলে দেবীর খাঁড়া তুলে তিনি ছুটে চললেন মন্দিরের দিকে। কিন্তু বেশীদূর তাঁর যাওয়া হল না। ইতিমধ্যেই তাঁর পথরোধ করে দাঁড়িয়েছে পরিবারের একটি মেয়ে। শোনা যায় সেদিন রাত্রে দেবী নাকি পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছিলেন, 'আমি এ বাড়ি ছেড়ে চললাম, এই গৃহের গৃহবধূ বিবাহের আয়োজন করেছিলেন তাই এঁরা চিরকাল দুঃখী হবে। আর এই গৃহের কন্যারা আমার কথামত বিবাহের বিরুদ্ধে ছিল তাই চিরকাল এঁদের উপর আমার আশীর্ব্বাদ থাকবে,'-সেদিনের পরে জাগ্রতা দেবী গৃহত্যাগ করেছিলেন, আর সাধকটি সমস্ত জীবন বন্ধ উন্মাদ হয়ে কাটিয়েছিলেন। দেবীর অভিশাপ ও বরদানের ফল বাস্তবে কতটা ফলবতী হয়েছিল তা বলতে পারা যায় না। তবে এখনও দেবীর আশীর্বাদের প্রসঙ্গটি পরিবারের কন্যারা অতিভক্তির সঙ্গে স্মরণে রাখেন।

এই শাক্ত পরিবারের পারিবারিক ইতিহাসটি তুলে ধরার কারণ তৎকালের বাংলার একটি পরিবারের আধ্যাত্মিক ভাবধারাকে তুলে ধরা। সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে আধ্যাত্মিক ইতিহাস সর্বদাই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তখন মাতৃসাধনা এমন গভীর ভাবে সমাজের সঙ্গে জড়িত ছিল, যে দেবী পরিবারের একজন সদস্যরূপেই পরিগণিত হতেন। আউল, বাউলের সাধনভূমি বাংলার এই মাতৃসাধকেরাই মাতৃনামের বান ডেকেছিলেন। আর এঁরাই সতীপীঠগুলিকে জাগ্রত রেখেছিলেন তাঁদের ভক্তির উত্তাপে।

মধ্যযুগে বাংলার পারিবারিক ইতিহাস থেকে আবার আমরা বর্তমানের সতীপীঠ আলোচনায় ফিরে আসব। একান্ন পীঠ গ্রন্থটি রচনাকালে মাতৃতত্ত্বের দুরূহ রহস্যভেদে উপকৃত হয়েছি রামকৃষ্ণ মিশনের বিশিষ্ট সন্ন্যাসী ভারতবর্ষে দেশীয় ভাষায় নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত শতবর্ষ প্রাচীন সাময়িক পত্রিকা উদ্বোধনের সম্পাদক পূজনীয় শ্রীমৎ স্বামী পূর্ণাত্মানন্দজী মহারাজের কাছ থেকে। দেবীতত্ত্ব সম্বন্ধে তাঁর বহু আলোচনা ও রচনার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি এবং তা থেকেই আমার এই বিষয়ে আগ্রহ ও গবেষণা পরিপুষ্ট হয়েছে একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। 'বর্তমান' পত্রিকার রবিবারের পাতায় ধারাবাহিকভাবে একান্ন পীঠ প্রকাশিত হয়েছিল। এই বিভাগের দায়িত্ব প্রাপ্ত কাকলিদি (কাকলি চক্রবর্তী) ও সাহানা দি (সাহানা নাগচৌধুরী) আমাকে মূল্যবান উপদেশ ও উৎসাহ দিয়ে সাহায্য করেছেন। তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। 'ভারতের একান্নটি সতীপীঠ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লেখা প্রকাশ করার পরিকল্পনা প্রথম আমাকে দিয়েছিলেন বর্তমান পত্রিকার জয়েন্ট নিউজ এডিটর শ্রীঅশোক বসু। এর জন্য তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। অবশ্য প্রথমে তাঁর মুখে বিষয়টি শুনে মোটেই উৎসাহিত হইনি। কারণ প্রথমত, বিষয়টি সম্বন্ধে কিছুই তখন জানতাম না, দ্বিতীয়ত, এ যুগের মানুষ সতীপীঠ সম্বন্ধে আগ্রহ প্রকাশ করবেন এ ধারণা আমার ছিল না। দ্বিধা নিয়েই পড়াশুনা আরম্ভ করেছিলাম। সূচনায় যে দ্বিধা ছিল শেষে গিয়ে সেই দ্বিধাই যেন পূজা হয়ে গেল। মাতৃপীঠ পরিক্রমায় তৃপ্ত আমি।

গ্রন্থটির নির্দেশিকা প্রস্তুতে সাহায্য করেছেন আমার শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সুনীলবিহারী ঘোষ। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে গ্রন্থের নির্দেশিকা কি করে প্রস্তুত করতে হয় তা তিনি আমায় শিখিয়েছেন। গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতে সাহায্য করেছেন শিবানী রায়-এঁদের দুজনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। গ্রন্থটির জন্য রামকৃষ্ণ মিশন ইনসস্টিটিউট অফ কালচারের লাইব্রেরী থেকে সাহায্য গ্রহণ করেছি।

সর্বশেষে ধন্যবাদ দিই বাংলার বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী প্রকাশক 'মিত্র ঘোষ' গোষ্ঠীর কর্ণধার শ্রীসবিতেন্দ্রনাথ রায়কে, পিতৃপ্রতিম এই মানুষটি অতি আগ্রহের সঙ্গে এই গ্রন্থ প্রকাশ করতে চেয়েছেন। বাড়িতে আমার পড়াশুনা ও গবেষণার পরিবেশটি অনুকূল করে রাখতে আমার মা (মিনতি সেনগুপ্ত), বাবা (শ্রীপ্রশান্ত সেনগুপ্ত) ও দুই ভাই (প্রীতম ও প্রিয়ম) সবিশেষ সাহায্য করেছেন। রবিবারের পাতায় একান্নপীঠ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার সময় বহু পাঠক চিঠিতে তাঁদের মতামত জানিয়ে আমায় উৎসাহিত করেছেন। আশা করি গ্রন্থটিও সাধারণ পাঠক, গবেষক ও মাতৃতত্ত্বজিজ্ঞাসুদের কৌতূহল নিবৃত্ত করবে। তাঁদের কাছে সমাদৃত হলে আমি আমার শ্রম সার্থক হয়েছে বলে মনে করব।"

১২/১ ওয়েস্ট রোড

পূর্বা সেনগুপ্ত

সন্তোষপুর 

পর্যালোচনা ও রেটিং

0 মোট 5.0 -এ
(0 পর্যালোচনা)
এই বইয়ের জন্য এখনও কোন পর্যালোচনা নেই

সংশ্লিষ্ট বই

বই সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা (0)

প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য

অন্যান্য প্রশ্নাবলী

কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি